হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?




◽প্রাক-কথন:

হোমিওপ্যাথি, ১৮ শতকের শেষের দিকে উদ্ভুত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। এর প্রবক্তাগণ সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে টিউমার-ক্যান্সার এর চিকিৎসায়ও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ। যাইহোক, বিজ্ঞানী মহল হোমিওপ্যাথিকে মূলত ছদ্মবিজ্ঞান হিসাবে চিহ্নিত করে। হোমিওপ্যাথির কার্যপদ্ধতি আধুনিক বিজ্ঞানের মূলনীতি সমূহের সাথে সাংঘর্ষিক এবং একেবারে অযৌক্তিক। এই প্রবন্ধে আমরা কেন হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞান নয় তার কারণগুলো ব্যাখ্যা করবো, বিশেষ করে কার্ল পপারের "সায়েন্স-সিউডোসায়েন্স ডিমার্কেশন" মানদণ্ডের মাধ্যমে। একইসাথে আমরা হোমিওপ্যাথির ইতিহাস ও এর মূল নীতিগুলোর চুল চেড়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলো কেন আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক তা ব্যাখ্যা করব এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবনে আপাত-আরোগ্যের ক্ষেত্রে প্লাসিবো এফেক্টের ভূমিকা কতটুকু তা জানাবো।


◽হোমিওপ্যাথির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

হোমিওপ্যাথির প্রবর্তক হলেন স্যামুয়েল হ্যানিম্যান (১৭৫৫-১৮৪৩)। হ্যানিম্যানের সময়ে চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমান কালের মতো উন্নত ছিল না। তখনকার চিকিৎসকেরা অনেক সময়ই আরোগ্যের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীর রক্তপাত ঘটাতেন, মনে করতেন এভাবে রক্ত পরিশুদ্ধ হয় এবং দূষিত রক্ত ফেলে দিলে সব রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এতে অনেক রোগীই অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে মারা যেতো।  হ্যানিম্যান এই পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এর থেকে কোমল এবং আরও কার্যকর পদ্ধতির সন্ধানে মনোনিবেশ করেছিলেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দ্রব্য নিয়ে করা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাকে হোমিওপ্যাথির মূল নীতি প্রণয়ন করতে উদ্বুদ্ধ করে: ❝like cures like❞। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, সিনকোনার ছাল উচ্চ মাত্রায় খাওয়ার ফলে ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এই পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে, হ্যানিম্যান ভেবেছিলেন—  ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে ঐ পদার্থের ডাইলিউটেড ডোজ (অতি নগণ্য পরিমাণে কোনো পদার্থকে দ্রাবকের সাথে মেশানো দ্রবণ) দেয়া হলে ম্যালেরিয়া মোকাবেলায় শরীরের প্রাকৃতিক নিরাময় প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে পারে। হ্যানিম্যানের সময়ে ইউরোপে প্রচলিত চিকিৎসা-পদ্ধতি অনুসারে স্বাস্থ্য চারটি শারীরিক " Humour" এর ভারসাম্যের উপর নির্ভরশীল: রক্ত, কফ, কালো পিত্ত এবং হলুদ পিত্ত; এগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। হ্যানিম্যান ভেবেছিলেন, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবনে "Life Energy" উদ্দীপিত হওয়ায় এগুলোর ভারসাম্য রক্ষা হয় এবং আরোগ্যলাভ হয়। ১৮১০ সালে তিনি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের তালিকা, প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে "The Organon of the Healing Art" নামে একটি বই লিখেন। এছাড়া, মৃত্যুর আগে আরও কয়েকটি বইয়ে তার এই ধারণাগুলো লিখে যান। এই বইগুলোই হোমিওপ্যাথির ভিত্তি।

হোমিওপ্যাথি ১৯ শতকে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় বেশ জনপ্রিয় হয়। হোমিওপ্যাথি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির মতো কাঁটা-ছেড়া ও রক্তপাত ঘটায়নি। তাছাড়া, তখন কলেরার চিকিৎসা করা হতো অধিক মাত্রায় কর্পূর সেবনের মাধ্যমে ফলে, রোগী লিভার বিকল হয়ে মারা যেত। সিফিলিস নামক যৌনরোগের চিকিৎসায় পারদের ব্যবহার হতো যা কিনা বিষক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। হ্যানিম্যানের ডাইলিউটেড মেডিসিন গ্রহণের মতবাদের কারণে এই ধরণের বিষক্রিয়া ও অপদ্রব্যের প্রয়োগ হ্রাস পায়। ফলে রোগীদের মৃত্যুও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। ফলে, তখন হোমিওপ্যাথি স্বল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।



 ◽হোমিওপ্যাথির মূল নীতি:

 হোমিওপ্যাথি দুটি প্রধান নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত—

১. Succussion and Dilution: 

হ্যানিম্যান "succussion" ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। হোমিওপ্যাথিতে succussion বলতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দ্রব্য অতি অল্প পরিমাণে দ্রাবকের সাথে মিশিয়ে ডাইলিউট করে পুনরায় ঐ ডাইলিউটেড সলিউশনকে আরও বেশি পরিমাণ দ্রাবকের সাথে মিশিয়ে ঝাঁকানোকে বোঝায়। হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলো ধারাবাহিক ডাইলিউশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা এই প্রক্রিয়াটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ক্ষমতা বাড়ায় বলে বিশ্বাস করেন।

একটি নির্দিষ্ট উপাদান (উদ্ভিজ, খনিজ বা প্রাণীজ দ্রব্যের নির্যাস) বারংবার পানি কিংবা অ্যালকোহলে মিশ্রিত হয়। এই উপাদানকে মাদার টিঙ্কচার বলে। কখনো কখনো, কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থেকে প্রাপ্ত এক্স্যাক্ট (মাদার টিঙ্কচার) ল্যাকটোজ বা চিনির বড়ি টপিকাল ক্রিমে যোগ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, সাপের বিষ, আর্সেনিক বা অন্যান্য বিষাক্ত ভারী ধাতুর মতো পদার্থও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ডাইলিউশনের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। হোমিওপ্যাথিতে ডাইলিউশন প্রক্রিয়াটি সাধারণত দশমিক কিংবা শতাংশের স্কেল অনুসরণ করে। যেমন, 1X ডাইলিউশন মানে হলো ভাগ মাদার টিঙ্কচারের সাথে ভাগ পানি কিংবা অ্যালকোহল মেশানো আর 1C মানে হলো ভাগ মাদার টিঙ্কচারের সাথে ৯৯ ভাগ পানি কিংবা অ্যালকোহল মেশানো। সাধারণত হোমিওপ্যাথরা মাদার টিঙ্কচারকে এর চেয়ে বেশি মাত্রায় ডাইলিউট করে (30C থেকে 200C!)। 30C মানে হলো ভাগ মাদার টিঙ্কচারকে 10^60 ভাগ দ্রাবকের সাথে মেশানো! একসাথে এতবড় ডাইলিউশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অসম্ভব তাই হোমিওপ্যাথরা প্রক্রিয়াটি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করেন (নিম্নের চিত্র দ্রষ্টব্য)। যেমন, 30C ডাইলিউশনের জন্য তারা ১:১০০ অনুপাতে ৩০ বার ডাইলিউশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।

চিত্র: ধারাবাহিক ডাইলিউশন প্রক্রিয়া।


২. Like Cures Like (Similia Similibus Curentur):

এই নীতি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মূল স্তম্ভ। হ্যানিম্যানের এই মত অনুসারে, একটি নির্দিষ্ট দ্রব্য কোনো সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে কোনো রোগের লক্ষণগুলো তৈরি করে তা অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে ঐ রোগের লক্ষণগুলোকে নিরাময় করতে পারে। হোমিওপ্যাথরা রোগীর উপসর্গগুলি পর্যবেক্ষণ করে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক পদার্থের (উদ্ভিজ, খনিজ বা প্রাণীজ দ্রব্য) উচ্চমাত্রায় (ডাইলিউটেড নয়) প্রয়োগে তৈরি হওয়া উপসর্গগুলির সাথে তুলনা করে। এই তুলনার উপর ভিত্তি করে, একজন হোমিওপ্যাথ একটি ঐ দ্রব্যকে ডাইলিউট করার পরে রোগীকে সেবন করতে বলেন।  নির্বাচন করে যা রোগীর লক্ষণগুলির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলে। এই ওষুধ প্রতিটি ব্যক্তির জন্য পৃথকভাবে নির্বাচিত হয়। যেমন, ক্ষত, ট্রমা এবং ব্যাথার চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথরা মাউন্টেন ডেইজি গাছের এক্স্যাক্ট ডাইলিউট করে (আর্নিকা মন্টানা) প্রয়োগ করেন। এই মাউন্টেন ডেইজির রস উচ্চ মাত্রায় সেবন করলে ব্যাথার উপসর্গ দেখা দেয়, তাই হোমিওপ্যাথরা ভেবে নিয়েছেন এই মাউন্টেন ডেইজি অতি অল্প মাত্রায় (ডাইলিউশন) প্রয়োগ করলে ব্যাথার উপসর্গ কমবে। আবার, আপনি সিস্টের চিকিৎসার জন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি আপনাকে সিস্টের উপসর্গ বাড়ানোর জন্য দায়ী কোনো দ্রব্য একেবারে ডাইলিউট ডোজে সেবন করতে প্রেসক্রাইব করবেন। 



◽কেন হোমিওপ্যাথি অকার্যকর এবং বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক?

১. বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব: 

আজ পর্যন্ত হোমিওপ্যাথির স্বপক্ষে একটা প্রমাণও পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, পিয়ার রিভিউড জার্নালসমূহে প্রকাশিত বিভিন্ন সিস্টেম্যাটিক রিভিউ এবং মেটা অ্যানালাইসিসে বিজ্ঞানীরা হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে অকার্যকর ঘোষণা করে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবনের কারণে আপাত-রোগমুক্তির ঘটনাকে প্লাসিবো এফেক্টের ফল বলে উল্লেখ করেছেন  [১],  [২],  [৩]। 

চলুন, রেফারেন্সে থাকা এই সিস্টেম্যাটিক রিভিউ ও মেটা অ্যানালাইসিসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়টিকে বিশ্লেষণ করে দেখি (বাকিগুলো সম্পর্কে লিখলে এই প্রবন্ধটি আরো বড় হয়ে যাবে, সেগুলো রেফারেন্স অংশে থাকা লিংকে গিয়ে সময় করে পড়ে ফেলতে পারেন)। 

The Lancet জার্নালে ২০০৫ সালে "Are the clinical effects of homoeopathy placebo effects? Comparative study of placebo-controlled trials of homoeopathy and allopathy" শিরোনামে Aijing Shang এর নেতৃত্বে একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ [২] প্রকাশিত হয়। এই সিস্টেম্যাটিক রিভিউতে গবেষকদল বলেছেন, "there was weak evidence for a specific effect of homoeopathic remedies, but strong evidence for specific effects of conventional interventions. This finding is compatible with the notion that the clinical effects of homoeopathy are placebo effects." বাংলায় বললে, "হোমিওপ্যাথির প্রয়োগে আরোগ্যলাভের পক্ষে প্রমাণ খুবই দুর্বল। তাই বলা যায় হোমিওপ্যাথির ক্লিনিক্যাল এফেক্ট (কোনো ঔষধের প্রয়োগের ফলে পর্যবেক্ষণযোগ্য ফলাফল বা পরিবর্তন) প্লাসিবো এফেক্টের ফল।" এই সিস্টেম্যাটিক রিভিউতে অপর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে, হোমিওপ্যাথি যেকোনো একক ক্লিনিকাল এফেক্টের জন্য স্পষ্টভাবে কার্যকর। প্রশ্ন হলো, গবেষকরা কীভাবে এই সিদ্ধান্ত দিলেন? এজন্য আপনাকে জানতে হবে কোনো ঔষধ কার্যকর কিনা তা নির্ণয়ের পদ্ধতি। ঔষধের কার্যকারিতা জানার জন্য Randomized Controlled Trial (RCTs) কে মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে, ভলান্টিয়ারদের এলোমেলোভাবে দুইটি আলাদা গ্রুপে ভাগ করা হয়। এক গ্রুপকে ঐ ঔষধটি এবং অন্য গ্রুপকে নিষ্ক্রিয় কোনো দ্রব্য গ্রহণ করতে দেওয়া হয়। শেষ অবধি কাকে কোনটা দেওয়া হয়েছে তা গবেষণার সাথে যুক্ত নয় এমন একটা দল ব্যতীত গবেষক ও ভলান্টিয়ারগণের কেউই জানে না (Duble Blind)। তারপর, তারা গ্রুপের মধ্যে ফলাফল তুলনা করেন, যদি নতুন ঔষধ ভলান্টিয়ারদের রোগ সারার সাথে কোরিলেটেড প্রমাণিত হয় তাহলে ধরে নেওয়া যায় ঔষধটি কার্যকরী। হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করার জন্য বেশ কিছু RCT পরিচালিত হয়েছে। এই RCT সমূহের উপর ভিত্তি করেই উপরে উল্লেখিত সিস্টেম্যাটিক রিভিউতে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সবক্ষেত্রেই হোমিওপ্যাথিক ঔষধের প্রয়োগের ফল ও নিষ্ক্রিয় দ্রব্য প্রয়োগের ফল সমান। অর্থ্যাৎ, এটা প্রমাণিত হয় যে হোমিওপ্যাথির আপাত-কার্যকারিতা প্লাসিবো এফেক্টের ফল ছাড়া আর কিছুই নয় ("হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও কদাচিৎ কাজ করে কেন?" অংশে প্লাসিবো এফেক্ট নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে)

হোমিওপ্যাথরা বিশ্বাস করে, হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দেহের “Life Energy” (Bioenergy নয়) কে উদ্দীপিত করার মাধ্যমে দেহের চারটি Humour এর ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে রোগমুক্তি দেয়। কিন্তু এমন লাইফ এনার্জির কোনো অস্তিত্ব নেই। এই Humour তত্ত্ব ভূল এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে অসমঞ্জস।


২. অকল্পনীয় লঘুকরণ (Dilution):

হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলো প্রায়শই 1:100 (মাদার টিঙ্কচার  ভাগ অনুপাত ৯৯ ভাগ পানি) অনুপাতে ডাইলিউট করে। হোমিওপ্যাথি অনুসারে ডাইলিউশনের মাত্রা যত বেশি হবে ওষুধ তত বেশি শক্তিশালী হবে। কতবার ১:১০০ অনুপাতে ডাইলিউট করা হয় সেটাকে বলে Potency, যদি ৩০ বার ধারাবাহিকভাবে ১:১০০ অনুপাতে ডাইলিউট করা হয় তাহলে ঐ ঔষধের মাত্রা হবে ৩০C। মানে এখানে ভাগ মাদার টিঙ্কচারকে 10^60 ভাগ দ্রাবকের সাথে মিশ্রিত করা হয়েছে! লিটার দ্রবকে 10^60 লিটার দ্রাবকে দ্রবীভূত করা হচ্ছে (হোমিওপ্যাথরা এই ডাইলিউশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন ধারাবাহিকভাবে, মানে 30C পটেন্সি তৈরির জন্য তারা ৩০ বার 1:100 অনুপাতে ডাইলিউট করবেন)! দ্রাবকের পরিমাণ এতটাই বেশি যে এই পরিমাণ পানি পুরো পৃথিবীতেও নেই (পুরো পৃথিবীতে পানির পরিমাণ প্রায় 3.785×10^12 লিটার)! সংখ্যাটা অকল্পনীয় রকমের বড়। এমনতরো ডোজের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই নেই। এভাবে চরম মাত্রায় ডাইলিউট করলে দ্রাবকে আপাতদৃষ্টিতে ঐ মূল দ্রব্যের (মাদার টিঙ্কচার) একটা অণুও থাকবে কিনা সন্দেহ। হ্যানিম্যানের সময়ে দ্রবণ-দ্রব-দ্রাবক নিয়ে বিজ্ঞানের কাছে তথ্য ছিলো কম। রসায়নের মৌলিক নীতিগুলো (যেমন: অণু ও পরমাণুর ধারণা) এবং স্টয়কিওমেট্রি তখন ভ্রুণ অবস্থায় ছিলো। তাই, হ্যানিম্যানের মনে এমন অবৈজ্ঞানিক ধারণার বিকাশ অস্বাভাবিক নয়।

আরও একটু গাণিতিক বিশ্লেষণে যাওয়া যাক। কোনো দ্রবণকে লঘুকরণের একটা সীমা আছে। নির্দিষ্ট মাত্রা পেরিয়ে গেলে ঐ দ্রবণে দ্রবের একটা অণু পর্যন্ত থাকবে না। ইথানলকে দ্রব আর পানিকে দ্রাবক হিসেবে নিলাম। ইথানলের মোল পরিমাণ (6.023×10^23 টি অণুর) ভর ৪৬ গ্রাম। একে ২৩X পাওয়ারের ওষুধ বানাতে হলে ভাগ ইথানলকে ১০^২৩ (১ এর পরে ২৩ টা ০) ভাগ পানির সাথে মেশাতে হবে! গাণিতিকভাবে দেখানো যায়, এমন করলে ৩ গ্রাম পানিতে শুধুমাত্র ১ অণু ইথানল থাকবে! যদিও হোমিওপ্যাথরা সচরাচর এর থেকে বেশি পাওয়ারের ওষুধ ব্যবহার করেন!

প্রকৃতপক্ষে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধে কোনো সক্রিয় উপাদান থাকেই না [৪]। কোনো সক্রিয় উপাদান না থাকায় এটা রোগ নির্মূল করতে অক্ষম। (একারণে, মোটাদাগে হোমিওপ্যাথির কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। ক্রিয়া থাকলে তো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে!)। কাজেই দ্রাবকে দ্রবের পরিমাণ কম হওয়া মানে সেটা শক্তিশালী ঔষধ এমন দাবী একেবারেই অযৌক্তিক। হোমিওপ্যাথিক জোচ্চরদের মতে, অতি মাত্রায় ডাইলিউট হলেও ঐ দ্রব্য মূল পদার্থের একটি "স্মৃতি" ধরে রাখে এবং এর ফলে রোগ নিরাময় হয় [৫]। কিন্তু এটা পুরোপুরি প্রমাণঅযোগ্য দাবী। ফিলোসোফার অফ সায়েন্স কার্ল পপারের ফলসিফায়াবিলিটির ক্রাইটেরিয়া এই দাবী কোনোভাবেই পেরোতে পারে না।


৩. কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা যায় না (অন্তত হোমিওপ্যাথিক নিয়মে):

"like Cures Like" একটা পরস্পরবিরোধী ধারণা। যে দ্রব্য (জীবাণু না!) কোনো রোগের উপসর্গ বাড়ায় সেই একই দ্রব্য আবার কীভাবে উপসর্গ কমাতে পারে?

ব্যাপারটা আরও পরিস্কারভাবে বুঝতে হলে ওষুধ কীভাবে কাজ করে তা জানা দরকার। রোগ বিভিন্ন ধরনের তাই ঔষধও রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসের মতো প্যাথোজেনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঔষধ ঐ নির্দিষ্ট প্যাথোজেনের টিকে থাকা ও প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেমকেই মডিফাই করে, যেমন ভ্যাক্সিন। হোমিওপ্যাথিক ঔষধের চেষ্টা একটাই—  রোগের উপসর্গ কমানো কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ঔষধ রোগের কারণ নির্মূল করে।

এক্ষেত্রে, রোগের কারণ নির্মূলের ঔষধ প্রয়োগ না করে Like Cures Like মতবাদের রোগের উপসর্গ বাড়ানোর জন্য দায়ী হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করলে তো হিতে বিপরীত হবে! আরোগ্য লাভের বদলে রোগের উপসর্গ বাড়বে। তবে অতিমাত্রায় ডাইলিউট থাকায় ঐ হোমিওপ্যাথিক দ্রব্য না পারবে উপসর্গ বাড়াতে, না পারবে কমাতে। কারণ এতে সক্রিয় উপাদানই নেই (কেন নেই সেটা নং পয়েন্টে আলোচিত হয়েছে)।

এবার অনেকে ভিটামিন A এর উদাহরণ টেনে বলতে পারেন যে like cures like সম্ভব। ভিটামিন A এর অভাবজনিত উপসর্গ এবং ভিটামিন A এর আধিক্যের উপসর্গ প্রায় একই। কিন্তু, এটা like cures like এর স্বপক্ষে প্রমাণ হতে পারে না কারণ কোনো দ্রব্যের রোগ সারানো এবং একই সাথে রোগের আরোগ্যের ক্ষমতা থাকার ঘটনা অতি নগণ্য। ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় না।


পুরো ব্যাপারটার সারসংক্ষেপ:

  • হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অতি মাত্রায় ডাইলিউটেড, ফলে এতে কোনো সক্রিয় উপাদান থাকে না।
  • Like Cures Like একটি খোঁড়া মতবাদ।
  • হোমিওপ্যাথি বিভিন্ন অনুমানের (হিউমার তত্ত্ব, লাইফ এনার্জি, পানির স্মৃতি) উপর প্রতিষ্ঠিত যার কোনো প্রমাণ নেই।

তাই, হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক। রোগ নিরাময় করার ক্ষমতা হোমিওপ্যাথির নেই।



◽হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও কদাচিৎ কাজ করে কেন?

১. প্লাসিবো এফেক্টের ভূমিকা:

অনেক ব্যক্তি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবন করে সুস্থ হয়েছেন বলে দাবী করেন। এই সুস্থতার মূলে রয়েছে প্লাসিবো এফেক্ট। যখন রোগীরা বিশ্বাস করে যে তারা কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করছে তখন তাদের মন এবং শরীর ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়, ঐ চিকিৎসার কার্যকারীতা থাকুক ছাই না থাকুক। আপনি যদি জ্বরাক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন এক চামচ চিনি খান এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে চিনি খেয়েই আপনি সুস্থ হবেন, তাহলে আপনার শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম হলো একটা ফ্লেক্সিবল টুল, একে বিভিন্নভাবে মডিফাই করা সম্ভব। চিনির জ্বর নিরাময়ের (জ্বর কিন্তু কোনো রোগ না, বিভিন্ন রোগের একটা সাধারণ উপসর্গ। এখানে সহজ উদাহরণ হিসেবে জ্বরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।) সামর্থ্য না থাকলেও শুধুমাত্র সুস্থতার ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত থাকলে আপনার দেহের ইমিউন সিস্টেম দ্রুত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। এটাই প্লাসিবো এফেক্ট। 

এরকম মনে হতে পারে যে, শিশুদের ক্ষেত্রে তো (infant) বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার নেই তাহলে এক্ষেত্রে প্লাসিবো কীভাবে কাজ করে? উত্তর আছে বৈকি। শিশুদের ক্ষেত্রেও প্লাসিবো এফেক্ট ঘটতে পারে [৬]। শিশুদের মধ্যে প্লাসিবো এফেক্টের সঠিক কার্যকারিতা এখনও গবেষণাধীন, তবে একটি আশাপ্রদ তত্ত্ব রয়েছে: Placebo by Proxy; এই তত্ত্ব অনুসারে, প্লাসিবো এফেক্ট সরাসরি শিশুর পরিবর্তে শিশুর পরিচর্যাকারী মাধ্যমে ঘটতে পারে। যখন পরিচর্যাকারী অভিভাবক বিশ্বাস করেন যে হোমিওপ্যাথি তার শিশুকে রোগমুক্তি দেবে, তখন তারা তাদের প্রতি ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে, আরও যত্ন এবং মনোযোগ প্রদান করে। যত্নশীল আচরণে শিশুর মনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটার মাধ্যমে শিশুর অবস্থার উন্নতি হতে পারে। এর স্বপক্ষে প্রমাণও [৭] আছে যদিও এর ক্লিনিক্যাল ইফেক্ট সামাণ্যই।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অতিমাত্রায় ডাইলিউট হওয়ায় এতে কোনো সক্রিয় উপাদান নেই। কিন্তু, প্লাসিবো এফেক্টের কারণে, রোগীরা আরোগ্য লাভ করতে পারে।

অনেকে ভাবতে পারেন, প্লাসিবো এফেক্ট বুঝি খুবই ভালো একটা ব্যাপার। আসলে, এটা ভালোও না খারাপও না। সর্দি-কাশির মতো ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভালোই কিন্তু টিউমার কিংবা যক্ষার ক্ষেত্রে এই প্লাসিবো এফেক্টই হতে পারে মৃত্যুর কারণ! প্লাসিবো এফেক্টের কারণে কোনো রোগের উপসর্গ দেরিতে দেখা দিতে পারে ফলস্বরূপ দ্রুত চিকিৎসা না নিতে পারায় মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রশ্ন আসতে পারে, অ্যালোপ্যাথিতেও কী প্লাসিবো এফেক্ট থাকে? হ্যাঁ থাকে, তবে হোমিওপ্যাথির সাথে অ্যালোপ্যাথির পার্থক্য হলো, হোমিওপ্যাথি প্লাসিবো ছাড়া রোগ সারাতে অক্ষম কিন্তু অ্যালোপ্যাথি প্লাসিবো ছাড়াই রোগ সারাতে সক্ষম।

তবে, সবক্ষেত্রেই প্লাসিবো এফেক্ট দায়ী এমন না। নানা ধরণের অটোইমিউন রোগ (যেমন: আঁচিল, কয়েক ধরণের আর্থ্রাইটিস) আছে যা আপনা-আপনি ওষুধ ছাড়াই সেরে যায়। হোমিওপ্যাথরা এমনকি গোপনে অ্যালোপ্যাথিক ঔষধও ব্যবহার করে।


২. রোগীর সাথে চিকিৎসকের মিথস্ক্রিয়া:

একজন হোমিওপ্যাথের সাথে পরামর্শ করার জন্য প্রায়ই একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎ এবং এর পাশাপাশি  ব্যক্তিগত আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। হোমিওপ্যাথরা এভাবে রোগীর  মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে এবং চিকিৎসকের উপর আস্থা জন্মানোর কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্লাসিবো এফেক্ট ঘটতে পারে। 

আবার, হোমিওপ্যাথিক অপচিকিৎসকরা অযথাই রোগীকে ভয় পাইয়ে দেয়। এই ভয়কে পুঁজি করে সে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বেচে এবং রোগীকে আশ্বস্ত করে যে এগুলো খেলেই সে সুস্থ হয়ে যাবে। প্রায়ই দেখা যায়, অনেক সদ্য বিবাহিত পুরুষ সহবাসের সময় স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে না পেরে হতাশায় ভোগে এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়। এর কারণ মূলত আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা কিছু পুরিয়া গছিয়ে দিয়ে এঁদের আশ্বস্ত করে, এই ওষুধ খেলেই সমস্যার সমাধান হবে। ফলে, রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং শুধুমাত্র প্লাসিবো এফেক্টের কারণে সমস্যার সমাধান হয়।


৩. আগেই আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ: 

বর্তমানে, সাধারণ মানুষ আরোগ্যের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথমে আধুনিক চিকিৎসার (পরবর্তী অংশে বোঝার সুবিধার্থে অ্যালোপ্যাথি শব্দটি ব্যবহার করবো। হ্যানিম্যান এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। যদিও, অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি নামে শ্রেণিবিভাগ করা ঠিক নয় কারণ আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিই নেই। হোমিওপ্যাথি, ইউনানী এগুলো সবই পরিত্যক্ত। হোমিওপ্যাথি কেন ছদ্মবিজ্ঞান অংশে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে) শরণাপন্ন হয়। কিন্তু কোনোক্রমে চিকিৎসা সঠিকভাবে না হওয়ায় রোগমুক্তি সহজে হয় না। ফলে তারা প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়ের পরামর্শে হোমিওপ্যাথের শরণাপন্ন হন। অনেকসময় দেখা যায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কারণে তারা সুস্থ হয়ে যান। তবে ব্যাপারটা এতো সরল না। এক্ষেত্রে প্রথমে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কারণেই আরোগ্যলাভ হয়েছে —এমন দাবী করা যায় না। এটা কোরিলেশন-কজেশন ফ্যালাসির মধ্যে পড়ে। তাছাড়া, অনেকে একইসাথে অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খান। তাই, এখানে হোমিওপ্যাথির ভূমিকাকে হাইলাইট করা আসলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের ধূর্ততা।


৪. বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ:

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা রোগীকে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেয়। ফলে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কোনো কার্যকারিতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কারণে রোগীর ইমিউন সিস্টেম ভালোভাবে কাজ করে এবং রোগী সুস্থ হয়ে যায়।


৫. গোপনে হোমিওপ্যাথির বদলে অ্যালোপ্যাথির ব্যবহার:

অনেক হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বদলে অ্যালোপ্যাথিক ঐষধ ব্যবহার করে। যেমন ব্যাথা কমাতে এরা স্টেরয়েডের গুড়া ব্যবহার করে। এটা করা মোটেও ঠিক না, কারণ স্টেরয়েডের অযাচিত ব্যবহার মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিসাধন করে [৭]। জ্বর সারাতে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সাথে প্যারাসিটামলের গুড়া মেশায়!

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে Terra Medica ফার্ম SANUM USA Corp. এর বিতরণ করা ছয় প্রকারের হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ৫৬ লট (অথবা ১৭৬৮ ইউনিট) প্রত্যাহার করেছিল কারণ, U.S. Food & Drug Administration এর রিপোর্ট অনুসারে এতে পেনিসিলিন (অ্যান্টিবায়োটিক) ছিল [৯]! যদিও এটা প্রমাণিত হয়নি যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মিশিয়েছিল তবে এটা হয়েও হয়ে থাকতে পারে।

এভাবে রোগ সারানোর কৃতিত্ব কিন্তু মোটেও হোমিওপ্যাথির না।



◽হোমিওপ্যাথি কেন ছদ্মবিজ্ঞান?

বিজ্ঞান এবং ছদ্মবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী তা যদি এককথায় বলতে হয় তবে সেটা এরকম: বিজ্ঞান হলো এমন একটা পদ্ধতি যা কোনো একটা দাবিকে ক্রমাগত মিথ্যা প্রমাণ করার মাধ্যমে আগায় এবং শেষ পর্যন্ত পক্ষে-বিপক্ষের তথ্য-উপাত্ত মোতাবেক যা দাঁড়ায় সেটাকে আপাতসত্য হিসেবে গ্রহণ করে; অন্যদিকে ছদ্মবিজ্ঞান হলো কোনো একটা দাবিকে সত্য প্রমাণের লক্ষ্য নিয়ে সেই অনুযায়ী শুধু স্বপক্ষের প্রমাণ যোগাড় করা এবং বিপক্ষের তথ্য-প্রমাণ ক্রমাগত অস্বীকার করার পদ্ধতি যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক।

হোমিওপ্যাথির এই সবগুলো বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। হোমিওপ্যাথরা তাদের দাবীসমূহ প্রমাণ করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে না, বরং অধিকাংশক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে তাচ্ছিল্য করে। হোমিওপ্যাথির মূলনীতিগুলোই বিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মের লঙ্ঘন করে। বহু দেশে তাই হোমিওপ্যাথি ব্যান করা শুরু হয়েছে [১০]। 

আজকাল হোমিওপ্যাথির সমর্থকরা হোমিওপ্যাথির পক্ষে অনেক আর্টিকেল প্রকাশ করেন, এসব আর্টিকেল প্রকাশের উদ্দেশ্য হোমিওপ্যাথিকে কার্যকর প্রমাণ করা। অর্থাৎ, তাদের আগে থেকেই  হোমিওপ্যাথির প্রতি কনফার্মেশন বায়াস থাকে, ফলে, মিথ্যা প্রমাণের উদ্দেশ্যে গবেষণা না করে সত্য প্রমাণের জন্য তারা বেছে বেছে শুধু হোমিওপ্যাথির পক্ষে প্রমাণ যোগাড় করে (চেরি পিকিং) যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক।

মোটাদাগে, হোমিওপ্যাথি অগ্রগতিহীন। বিজ্ঞানের ধর্ম পরিবর্তনশীলতা, কিন্তু ছদ্মবিজ্ঞান সহজে পরিবর্তিত হয় না। হোমিওপ্যাথির মূলনীতিসমূহের ২০০ বছরে কোনো পরিবর্তনই হয়নি। কিন্তু, যুগের সাথে তাল মেলাতে এর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণার সংমিশ্রণ করা হচ্ছে। ছদ্মবিজ্ঞান এমনটাই করে।

বিখ্যাত বিজ্ঞান দার্শনিক কার্ল পপার বিজ্ঞান এবং ছদ্মবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য একটি মানদণ্ড প্রস্তাব করেছিলেন: Falsifiability। তাঁর মতে কোনো দাবীকে বৈজ্ঞানিক হিসাবে বিবেচনা করার জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট পরীক্ষাযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে হবে যা সম্ভাব্য অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষার মাধ্যমে মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে।

হোমিওপ্যাথি এই ক্রাইটেরিয়নেতে ব্যর্থ হয়। প্রথমত, হোমিওপ্যাথির যে কোনো ক্লিনিক্যাল ইফেক্ট নেই তা প্রমাণিত। কিন্তু, হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা এই প্রমাণসমূহকে উপেক্ষা করে এমন কিছু নতুন দাবী করছে যেগুলো প্রমাণ করার জন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই। কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ পাওয়া না গেলে হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা এই দাবীগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তিত করে যাতে মিথ্যা প্রমাণের কোনো রাস্তাই খোলা না থাকে। যেমন তাদের মতে, দ্রাবকে কোনো দ্রব ডাইলিউট করলে দ্রাবক ঐ দ্রবের স্মৃতি মনে রাখে। এর প্রমাণ দিতে বললে তারা বলে যে, এটা পরীক্ষা  করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে মিথ্যাত্ব যাচাই করার পথ না থাকায় দ্রাবকের স্মৃতি থাকার দাবীকে অবৈজ্ঞানিক বলে খারিজ করে দেওয়া যায়। হোমিওপ্যাথরা বিশ্বাস করেন যে ডাইলিউটেড করার পরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঝাঁকালে এতে "হিলিং পাওয়ার" এর উদ্ভব হয়। এই দাবীর মিথ্যাত্য যাচাই করার কোনো উপায় নেই, তাই এই দাবীও অবৈজ্ঞানিক। হোমিওপ্যাথরা হোমিও ঔষধ হাতে নিয়ে যতই নাচানাচি আর কুদাকুদি করুক ওই তথাকথিত ঔষধে কোনো পরিবর্তন হয় না।


      হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা হোমিওপ্যাথির পক্ষে নানান কুযুক্তির এবং মিথ্যা কথার অবতারণা করে। এগুলোর কারণেও হোমিওপ্যাথিকে ছদ্মবিজ্ঞান বলা চলে। সবগুলো উল্লেখ করতে গেলে আলাদা একটা বই হয়ে যাবে। তাই বাছাইকৃত কয়েকটি কুযুক্তিপূর্ণ মিথ্যা দাবী এবং অপচেষ্টা এখানে উল্লেখ করা হলো:

১. দাবী: হোমিওপ্যাথি ২০০ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে চলে আসছে তাই এটা কার্যকর।

— এই দাবী Is Ought ফ্যালাসির অন্তর্গত। কোনো কিছু শত বছর ধরে চলে আসলে, হাজার হাজার মানুষ তাতে বিশ্বাস করলেই সেই চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর প্রমাণিত হয় না।

২. দাবী: আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান অনেক রোগের নিরাময় করতে ব্যর্থ তাই এটা ভুয়া।

— এটা ঠিক যে আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান অনেক রোগের নিরাময় করতে অক্ষম, তবে এর সাফল্যের তুলনায় এটা অতি নগণ্য। তাই বলে এটা ভুয়া হয়ে যায় না কাজেই এই দাবী Non Sequitur ফ্যালাসি।

৩. "নিরাময়" শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার।

— হোমিওপ্যাথরা নিরাময় শব্দটি দিয়ে বিভিন্ন বিষয় বোঝায়। কখনো রোগের উপসর্গ দেখা না গেলেই ধরে নেয় রোগ নিরাময় হয়েছে। কিন্তু এমনটা ঠিক না, উপসর্গ সাময়িকভাবে কমে গেলেই রোগ নিরাময় হয় না। যেমন ছত্রাক সংক্রমণ হলে অনেকসময় উপসর্গ কমে গেলেও সংক্রমণ নিরাময় হয় না। এক্ষেত্রে একই শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি Equivocation ফ্যালাসি।

৪. কেউ হোমিওপ্যাথির সমালোচনা করায় তাকে বিনা প্রমাণে "কর্পোরেট দালাল" বলে আখ্যা দেয়া।

Ad Hominem ফ্যালাসি। হোমিওপ্যাথির সমালোচনা বন্ধের জন্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টেনে আনা হয়েছে।

৫. হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবন করে সুস্থ না হওয়া রোগীদের বাদ দিয়ে যারা সুস্থ হয়েছে শুধু তাদের কথা প্রচার করা।

Cherry Picking ফ্যালাসি। কনফার্মেশন বায়াসের কারণে বেছে বেছে শুধু নিজের দাবীর স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা।

৬. দাবী: সরকার হোমিওপ্যাথির অনুমোদন দিয়েছে, তাই হোমিওপ্যাথি কার্যকর।

Appeal to the questionable authority ফ্যালাসি। হোমিওপ্যাথি কার্যকর কিনা এটা নির্ধারণের জন্য শুধু সরকার প্রপার অথোরিটি না। কারণ, সরকার মোটেও নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। আর সরকার সবসময় বিজ্ঞান মোতাবেক চলে না। কাজেই, সরকারের দোহাই দিয়ে "হোমিওপ্যাথি ছদ্মবিজ্ঞান না" —এমন বলা অযৌক্তিক।

৭. দাবী: হোমিওপ্যাথিক ঔষধের মাঝে গোপন শক্তি আছে, বিজ্ঞান খুঁজে বের করতে পারবে না। তাই হোমিওপ্যাথি কার্যকর।

— Argument from ignorance ফ্যালাসি। হোমিওপ্যাথির ঐ গোপন শক্তি খুঁজে পাওয়া না গেলে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয় না। কোনো প্রমাণ ছাড়াই হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মাঝে গোপন শক্তি আছে এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। "That which can be asserted without evidence can also be dismissed without evidence." ~ Christopher Hitchens.

৮. দাবী: "পানির স্মৃতি আছে"— এটা বিজ্ঞান প্রমাণ করতে না পারলেও হোমিওপ্যাথি কাজ করে।

 কোনো একটা দাবী যে উত্থাপন করে, প্রমাণ করার দায়িত্ব তার উপরেই বর্তায়। হোমিওপ্যাথি দাবী করে, পানির স্মৃতি আছে। তাই এর প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্বও হোমিওপ্যাথির। আদতে, হোমিওপ্যাথি এই দাবীর পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে না পারায় বিজ্ঞানের উপর Burden of Proof চাপিয়ে দেয়। এই দাবীর কোনো এম্পিরিক্যাল এভিডেন্স না থাকায় একে বিজ্ঞান নাকচ করে।

৯. দাবী: বর্তমান হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা সৎ নয়, তাই হোমিওপ্যাথি কার্যকর হলেও কাজ করছে না।

—No true scotsman ফ্যালাসি। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের অসততার কথা তুললেই হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয় না।

১০. অ্যালোপ্যাথি শব্দের অযাচিত ব্যবহার (প্রায় সবাই এই নিয়ে ধোঁয়াশায় থাকে)।

— হ্যানিম্যানের সময়ে ইউরোপে প্রচলিত চিকিৎসা-পদ্ধতি অনুসারে স্বাস্থ্য চারটি শারীরিক " Humour" এর ভারসাম্যের উপর নির্ভরশীল: রক্ত, কফ, কালো পিত্ত এবং হলুদ পিত্ত। তখনকার চিকিৎসকরা ভাবতো এগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাছাড়া, চিকিৎসার জন্য প্রায়শই রক্তপাতের মাধ্যমে রক্ত শুদ্ধকরণ করা হতো। এই ইচ্ছাকৃত রক্তপাতের কারণে শত-শত মানুষ রক্তশূন্যতায় মারা যেত। সামগ্রিকভাবে, ইউরোপে ১৮ শতকের চিকিৎসা-পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল প্রাচীন তত্ত্ব, কুসংস্কার এবং অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণের সংমিশ্রণে যার মধ্যে শারীরস্থান, শারীরবিদ্যা এবং জীবাণু তত্ত্বের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণা ছিল।

হ্যানিম্যান এই চিকিৎসা-পদ্ধতিকেই অ্যালোপ্যাথি বলে আখ্যা দেন। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আর হ্যানিম্যানের সময়ে প্রচলিত চিকিৎসা-পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান শত শত গবেষক-বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফসল, ১৮ শতকের চিকিৎসা পদ্ধতির ধ্যান-ধারণা বর্তমানে অচল। অ্যালোপ্যাথি শব্দের ব্যবহার মানে ১৮ শতকের চিকিৎসা পদ্ধতিকে বর্তমানের আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানকে একই বিষয় মনে করা! দিনে-দুপুরে Equivocation ফ্যালাসির ব্যবহার!

অন্যভাবে ভেবে দেখুন, আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের evidence based medicine, pharmacology, neurology, pathology, surgery, ophthalmology, hematology, cardiology, oncology, orthopedics, urology, endocrinology সহ সকল বিষয়কে ২০০ বছর আগে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে বোঝানো শব্দ: অ্যালোপ্যাথি দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে! অ্যালোপ্যাথি শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে,  হোমিওপ্যাথি আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সমতুল্য। কত বড় জোচ্চুরি!

      অনেক মানুষ বলে, হ্যানিম্যান নিজে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও হোমিওপ্যাথিতে শিফট করেছিলেন, তাই হোমিওপ্যাথিকে কার্যকর হতেই হবে।

 — এই ধরণের কথা অবান্তর কারণ, এখানে অ্যালোপ্যাথি শব্দের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও হ্যানিম্যানের সময়ে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে সমান দেখানো হচ্ছে। নিতান্তই Equivocation ফ্যালাসি। উপরের স্টেটমেন্টে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে আখ্যায়িত করে আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞাত চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হ্যানিম্যানের সময়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবির্ভাবই হয়নি, ওনাকে আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান সম্পর্কে জ্ঞাত চিকিৎসক ভাবা চরম মূর্খতার পরিচয়। আর আশ্রয়বাক্য থেকে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেটা Non Sequitur ফ্যালাসি। এটা হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণ করে না।

১১. দাবী: ভ্যাক্সিন ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধের কার্যপদ্ধতিকে একই।

হোমিওপ্যাথদের অনেকসময় বলতে দেখা যায়, হোমিওপ্যাথি ভ্যাক্সিনের মতো কাজ করে কিংবা ভ্যাক্সিন যেহেতু কার্যকর তাই Like Cures Like নীতি কার্যকর। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা সঠিক মনে হলেও এটা সঠিক নয়। কোনো রোগের জন্য দায়ী জীবাণুর দুর্বল প্রকরণকে শরীরে স্বল্প পরিমাণে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ট্রেইন করাই হচ্ছে ভ্যাক্সিনের কার্যপন্থা। এভাবে দেহে রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। দেহে ভবিষ্যতে প্রবেশ করতে পারে এমন জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া ভ্যক্সিনের কাজ। ভ্যাক্সিন আর হোমিওপ্যাথি এক নয় কারণ, ভ্যাক্সিন দেওয়া হয় এমন জীবাণুর বিরুদ্ধে যা আগে দেহে প্রবেশই করেনি, আর হোমিওপ্যাথি শরীরে উপস্থিত রোগের নিরাময়ের জন্য দেয়া হয় যার বিরুদ্ধে দেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে কাজ করা শুরু করেছে। হোমিওপ্যাথি ভ্যাক্সিনের মতো জীবাণুর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ট্রেইন করে না। তাছাড়া, হোমিওপ্যাথির ডাইলিউশনের মাত্রা চরম, ফলে হোমিওপ্যাথিক ওষুধে কোনো সক্রিয় উপাদান থাকেই না। ভ্যাক্সিন উৎপাদনে এমন ডাইলিউশন প্রক্রিয়া নেই।

১২. দাবী: হোমিওপ্যাথি কার্যকর কিনা এই বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নেই।

এই দাবীটা জবরদস্তিমূলক। হোমিওপ্যাথি কাজ করে কিনা এ বিষয়ে বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত দেওয়ার সক্ষমতা আছে। হোমিওপ্যাথি যে অকার্যকর সে ব্যাপারটাই "কেন হোমিওপ্যাথি অকার্যকর এবং বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক?" অংশে বর্ণনা করা হয়েছে। চিকিৎসা-বিজ্ঞান অনুসারে, RCT তে উল্লেখযোগ্য ফল আসলে তবেই কোনো ঔষধের কার্যকারিতা আছে বলে দাবী করা যায়। RCT তে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি।


      ভুয়া গবেষণা কিংবা কোনো গবেষণাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন:

হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা কখনো কখনো ভুয়া গবেষণা অথবা পিয়ার রিভিউ প্রসেসে উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই প্রকাশিত কোনো প্রি-প্রিন্ট গবেষণার রেফারেন্স টেনে হোমিওপ্যাথির পক্ষে সাফাই গায়। নিচের ছবিটি দেখুন। একটি দৈনিকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুসারে কোনো এক গবেষণায় হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

 
চিত্র: হোমিওপ্যাথি কার্যকর —এমন ক্লিকবেইট শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন।


এই প্রতিবেদনটি যিনি লিখেছেন তিনি অতি ধূর্তভাবে পিয়ার রিভিউ প্রসেসের মধ্য দিয়ে এখনো চলমান একটি গবেষণাপত্রের [১১] প্রি-প্রিন্ট ভার্শনকে (বিজ্ঞানী মহলের ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য অনেকসময় পিয়ার রিভিউ প্রসেসের আগেই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এটাই প্রি-প্রিন্ট গবেষণাপত্র) বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। গবেষণাপত্রটির কোথাও "হোমিওপ্যাথি কাজ করে" এমন দাবীর উল্লেখ নেই। কিন্তু প্রতিবেদক শিরোনামে লিখেছেন এই গবেষণায় হোমিওপ্যাথির সক্রিয়তা প্রমাণিত হয়েছে! ভাঁওতাবাজি যাকে বলে। এই গবেষণায় মূলত DilutionSuccussion প্রক্রিয়ার পরেও হোমিওপ্যাথিক ঔষধে ন্যানোপার্টিকেলের অস্তিত্ব এবং এর ভিন্ন বিন্যাস তৈরি হওয়ার ব্যাপারে আলোকপাত করে। হোমিওপ্যাথি কাজ করে কিনা —এটা এই গবেষণার আলোচ্য বিষয় নয়। কোনো ডাইলিউটেড ওষুধে মূল দ্রব্যের দু একটি অতিক্ষুদ্র কণা থাকলেই সেটা কর্যকর হয় না। হোমিওপ্যাথের রক্ষকরা ইদানীংকালে প্রস্তাব করছে যে Dilution এর সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঝাঁকালে (Succussion) মূল দ্রব্যের কিছু অংশ তরলের পৃষ্ঠে ভেসে ওঠে। একে বলে Froths floatation hypothesis. মজার ব্যাপার হলো, এর এখন অব্দি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ডাইলিউটেড হোমিওপ্যাথিক ঔষধে মাদার টিঙ্কচারের অল্প কিছু ন্যানো-পার্টিকেল থাকলেই হোমিওপ্যাথি কার্যকর বলে পরিগণিত হয় না, এতো অল্প মাত্রার কোনোকিছু আসলে সক্রিয়ভাবে রোগের বিরুদ্ধে কাজই করতে পারবে না। তাছাড়া, Like Cures Like এর ধারণাও তো বাতিল। তাই, হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না! আর এটাও ভূললে চলবে না যে এই গবেষণাপত্র এখনো পিয়ার রিভিউ প্রসেস পেরোয়নি। প্রি-প্রিন্ট গবেষণার উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনুচিত। প্রি-প্রিন্ট গবেষণার উপর নির্ভর করে ন্যানোপার্টিকেল থাকার দাবীকে প্রমাণিত ধরা যায় না। এভাবেই, হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা প্রি-প্রিন্ট গবেষণার রেফারেন্স টেনে এমনকি গবেষণার মূল বিষয়বস্তু বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে হোমিওপ্যাথির পক্ষে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ায়।

আবার নিচের স্ক্রিনশটটি দেখুন। এই গবেষণাপত্রে [১২] করোনার বিরুদ্ধে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু, অভিজ্ঞতালব্ধ উপাত্ত আর প্রস্তাবিত মডেলের কোনো পরীক্ষণ উপস্থাপন না করায় প্রধান সম্পাদক এই গবেষণাপত্রকে Retracted ঘোষণা করেন। এই হলো হোমিওপ্যাথির রক্ষকদের ভুয়া গবেষণার উদাহরণ।


চিত্র: হোমিওপ্যাথি কোভিড-১৯ সারাতে সক্ষম এমন দাবী করা ভুয়া গবেষণাপত্রের স্ক্রিনশট (ভালো কোয়ালিটিতে দেখতে ছবির ওপর ক্লিক করুন)।


এভাবে,  হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা ভুয়া গবেষণাপত্র প্রকাশ এবং কোনো গবেষণার সাথে জোরপূর্বক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্রমাণের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। বিজ্ঞানে এভাবে জোচ্চুরি চলে না। এগুলো ছদ্মবিজ্ঞানের লক্ষণ।


পুরো ব্যাপারটার সারসংক্ষেপ:

  • হোমিওপ্যাথির কতিপয় দাবী কার্ল পপারের ফলসিফায়াবিলিটি ক্রাইটেরিয়নে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ।
  • হোমিওপ্যাথির মূলনীতিসমূহ বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক।
  • হোমিওপ্যাথরা যখন তাদের মতবাদের ফাঁক চিহ্নিত করতে সমর্থ হয় তখন এই ফাঁক বন্ধ করতে আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের (কোয়ান্টাম তত্ত্বকেও বাদ দেয়নি [১৩]) সাথে হোমিওপ্যাথির মিশ্রণে জগাখিচুড়ি তৈরি করে এবং ভুয়া গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এতে তাদের উদ্ভট অনটোলজিকাল দাবি প্রমাণিত হয় না।
  •  তারা Burden of Proof বিজ্ঞানের উপরে চাপিয়ে দেয় অথচ কোনো দাবী যে করে, দাবীর পক্ষে প্রমাণ তাকেই দিতে হয়। 
  • হোমিওপ্যাথির রক্ষকরা চেরি-পিকিংয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র তাদের দাবীর পক্ষে প্রমাণ দেয় এবং যে প্রমাণ তাদের দাবীর বিরুদ্ধে যায় সেগুলোকে তারা প্রত্যাখ্যান করে এমনকি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকেও অস্বীকার করে।
  • হোমিওপ্যাথি অগ্রগতিহীন, যুগের সাথে তাল মেলাতে একে আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সংমিশ্রণের মাধ্যমে ❝বিজ্ঞানসম্মত❞ প্রমাণের জন্য এর রক্ষকরা অনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এসব বিবেচনায় হোমিওপ্যাথি ছদ্মবিজ্ঞান সাব্যস্ত হয়।



হোমিওপ্যাথি কী ব্যান করা উচিত?

হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কোনো কার্যকারিতা না থাকায় হোমিওপ্যাথির চর্চা বজায় রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। অনেকক্ষেত্রে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কারণে রোগী প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়—

টিউমারে আক্রান্ত রোগীদের কথাই ধরুন, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ টিউমার সারাতে অক্ষম। সাধারণত, ছোটখাটো সিস্টকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা টিউমার আখ্যা দিয়ে রোগীকে ভয় পাইয়ে দেয়। এই সিস্ট কোনো ওষুধ না খেলেও আপনা-আপনি সেরে যায়। কিন্তু কোনো কার্যকর ভূমিকা না রাখা সত্ত্বেও রোগ সারানোর ক্রেডিটটা পেয়ে যায় হোমিওপ্যাথি। কিন্তু, টিউমার কোনো কার্যকর অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ কিংবা অস্ত্রোপচার ছাড়া নিরাময় হয় না। সত্যিকার টিউমার নিয়ে রোগী যদি শুধু হোমিওপ্যাথিক ওষুধই গ্রহণ করে তাহলে প্রকৃত চিকিৎসার অভাবে টিউমার আরও বেশি বিস্তার লাভ করতে পারে। হোমিওপ্যাথিক অপচিকিৎসকদের কারণে রোগী রোগের ধরণ সম্পর্কে ভূল তথ্য জানে এবং সত্যিটা অনুধাবন করতে করতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।

যৌনরোগের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। হোমিওপ্যাথিক অপচিকিৎসক যৌনরোগের ধরণ সম্পর্কে রোগীকে মিসগাইড করে। ব্যাপারটা অনুধাবন করতে রোগী এতো বেশি সময় নিয়ে ফেলে যে প্রকৃত চিকিৎসাও পরবর্তীতে আর কাজ করে না।

জন্ডিস কোনো রোগ নয়, এটা বিভিন্ন ধরণের রোগের সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক অপচিকিৎসকদের কল্যাণে (!) মানুষ একে রোগ হিসেবে ধরে নেয়। HBsAg (+)ve বলতে বুঝায় যে রোগীর শরীরে কখনো না কখনো Hepatitis B Virus প্রবেশ করেছিল। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ছাড়াও জন্ডিসের আরও শত শত কারণ রয়েছে। তবে, বাংলাদেশে ভাইরাসজনিত জন্ডিসের একটা বড় অংশই Hepatitis A Virus এর কারণে হয়। এটা বিশ্রাম নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়, কোনো ঔষধ লাগে না। এ কারণে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ  অকার্যকরী হলেও জন্ডিস সেরে যায়। তবে কেউ যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আরোগ্যের জন্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের কাছে যায় তাহলে রোগ তো সারবেই না উল্টো রোগীকে আরও বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হবে।

এ তো গেল পরিচিত রোগগুলোর ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি কী করে তার বর্ণনা। এগুলো ছাড়া অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা আরোগ্যের বদলে ভোগান্তি ডেকে আনে। হোমিওপ্যাথিক হাঁতুড়েরা রোগ ও রোগের ধরণ নির্ণয়েও অক্ষম ফলে রোগী রোগ সম্পর্কে মিসগাইড হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা বর্তমানে ব্যবসা ধরে রাখতে এমবিবিএস ডিগ্রি ছাড়াই অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় প্রয়োগ করছে। হোমিও ঔষধের অপরিশোধিত অ্যালকোহল খেয়ে মৃত্যুর খবরও কয়েকদিন পরপর চাউর হয়। হোমিওপ্যাথির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, মোটের উপর একথা সত্য; ক্রিয়া থাকলে তবে তো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে। কিন্তু, এই দোহাই দিয়ে আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি এই বুজরুকি চলতে দেওয়া যায় না, এতক্ষণ পড়ার পর নিশ্চয়ই কারণটা বুঝেছেন।

এভাবে সাধারণ মানুষদের একটি অপচিকিৎসা গ্রহণ করতে দেওয়া যায় না। তাই, অনতিবিলম্বে হোমিওপ্যাথি চর্চা সকল রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা উচিত।



◽উপসংহার:

হোমিওপ্যাথি খাঁটি ছদ্মবিজ্ঞান। হোমিওপ্যাথি কদাচিৎ কাজ করে কারণ এর মূলে রয়েছে প্লাসিবো এফেক্ট। হোমিওপ্যাথিকে আরও কিছুদিন টিকিয়ে রাখতে এর রক্ষকেরা একে বিজ্ঞানের মোড়কে অযাচিতভাবে মুড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। এই অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। হোমিওপ্যাথিকে বাংলাদেশসহ সকল রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবী।


◽রেফারেন্স:

[১] Ernst E. A systematic review of systematic reviews of homeopathy. British Journal of Clinical Pharmacology. 2002; 54(6): 577-582

[২] Shang A, et al. Are the clinical effects of homoeopathy placebo effects? Comparative study of placebo-controlled trials of homoeopathy and allopathy. The Lancet. 2005; 366(9487): 726-732

[৩] Linde K, et al. Are the clinical effects of homoeopathy placebo effects? A meta-analysis of placebo-controlled trials. The Lancet. 1997; 350(9081): 834-843

[৪] Thompson TD, Weiss M. Homoeopathy – what are the active ingredients? An exploratory study using the UK Medical Research Council's framework for the evaluation of complex interventions. BMC Complementary and Alternative Medicine. 2006; 37(6)

[৫] Beauvais F. Memory of water and blinding. Homoeopathy. 2008; 97(1): 41-42

[৬] Colloca L, Placebo Effects in Infants, Toddlers, and Parents. JAMA Pediatrics. 2015; 169(5): 504-505.

[৭] Burkart L. T., Kraus A, et al. Proxy in Neonatal Randomized Controlled Trials: Does It Matter? Children. 2017; 4(6): 43

[৮] National Institute on Drug Abuse website. Anabolic Steroids and Other Appearance and Performance Enhancing Drugs (APEDs). [Online].; 2024 [cited 2024 April 15] Available from: https://nida.nih.gov/research-topics/anabolic-steroids

[৯] Homeopathy company recalls products after they’re found to contain ANTIBIOTICS. [Online].; 2014. [cited 2024 April 15] Available from: https://www.dailymail.co.uk/health/article-2588927/Homeopathy-company-recalls-products-theyre-contain-ANTIBIOTICS.html

[১০] List of Countries where Homeopathy is banned [Updated List]. [Online].; 2024 [cited 2024 April 15] Available from: https://www.geeksforgeeks.org/list-of-countries-where-homeopathy-is-banned-updated-list/

[১১] Vithoulkas G, Berghian-Grosan C, et al. Ultra-high dilutions analysis: Exploring the effects of potentization by electron microscopy, Raman spectroscopy and deep learning. Journal of Molecular Liquids. Preprint. 2024; 401(124537): ISSN 0167-7322

[১২] Kalliantas D, Kallianta M, Karagianni Ch. S. RETRACTED ARTICLE: Homeopathy combat against coronavirus disease (Covid-19). Journal of Public Health. 2021; 29(1): 253

[১৩] Vithoulkas G, Berghian-Grosan C. The Spin of Electrons and the Proof for the Action of Homeopathic Remedies. Journal of Medicine and Life. 2020; 13(3): 278–282


© Naturalist's View

Comments

  1. চমৎকার বিশ্লেষণ। এভাবে ছদ্মবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে লেখা চালিয়ে যান।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধৈর্য্য ধরে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

      Delete
  2. অসাধারণ নিবন্ধ। 💜💙

    ReplyDelete
  3. অয়ন মন্ডল16 April 2024 at 13:29

    Nailed it!

    ReplyDelete
  4. বেশ বড়!!! 😞

    ReplyDelete
  5. ব্যাপক পরিমাণ মিথ্যা এবং অবৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে ভরপুর এ প্রবন্ধটি। সেই সাথে হোমিওপ্যাথি বিদ্বেষী একজন মানুষের অহেতুক বিদ্বেষ মূলক আচরণ। বিজ্ঞানের বহু গবেষণা মানুষের মানুষের বুঝতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়েছে। এমনকি সেই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীকে পর্যন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার ইতিহাস রয়েছে। হোমিওপ্যাথি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য তারপরও কিছু মানুষের চুলকানি থাকবেই

    ReplyDelete
    Replies
    1. ১. কী কী মিথ্যা ও অবৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া হয়েছে তা চিহ্নিত করার মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন করুন। বিনা প্রমাণে "সব মিথ্যা", "সব মিথ্যা" বলে চেঁচিয়ে Irrationality এর পরিচয় না দেওয়াই ভালো। হোমিওপ্যাথি একটা ছদ্মবিজ্ঞান, জোচ্চুরি। জোচ্চুরিকে জোচ্চুরি বললে যদি হোমিওপ্যাথি বিদ্বেষী বানিয়ে দেন তাহলে তাই সই।

      ২. আপনি আপনার কমেন্টের ৪র্থ লাইনে গ্যালিলিও আর্গুমেন্ট ফ্যালাসি ব্যবহার করেছেন। এই পোস্টে রেফারেন্স উপস্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন উদাহরণসহ হোমিওপ্যাথি যে ছদ্মবিজ্ঞান তা প্রমাণ করা হয়েছে। হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মসমূহকে লঙ্ঘণ করে তাই এটি বিজ্ঞান নয়। হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করা মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকেই অবমাননা করা। গ্যালিলিও তাঁর যুক্তির স্বপক্ষে পর্যবেক্ষণ ও যাচাইযোগ্য তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর বিচারকদের একবারও সেগুলো বিবেচনায় আনার কথা মনে হয়নি। এই মুর্খ বিচারকদের সাথে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির তুলনা চলে না। গ্যালিলিওর উদাহরণ টেনে আপনি গ্যালিলিওর শাস্তিদাতা মুর্খ বিচারকদের মতোই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে অবজ্ঞা করে হোমিওপ্যাথির জন্য সমর্থন আশা করছেন।

      ফ্যালাসি ব্যবহার না করে পোস্টের গঠনমূলক সমালোচনা করুন।

      Delete
    2. লেখাটা পড়ে বুঝতে পারছি কোনো একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে হোমিওপ্যাথিকে ছদ্মবিজ্ঞান ও প্লেসিবো চিকিৎসা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। হোমিওপ্যাথি সম্বন্ধে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আপনার থেকে আমার অনেক বেশি আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে কি কোনো প্লেসিবো চিকিৎসা কাজ করে? কোনো বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতির উপর গাঢ় বিশ্বাস ওদের ক্ষেত্রে কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমার মেয়েকে জন্মের পর থেকে বহু বছর অবধি অসুস্থ হলে শুধুমাত্র হোমিওপ্যাথিই করেছি। অসাধারণ কাজ পেয়েছি। একটি দু বছরের বাচ্চার কপালের বিশাল বড় টিউমার কি ভাবে অপারেশন ছাড়া নির্মূল করে দিয়েছে হোমিওপ্যাথি সেটাও নিজের চোখে দেখেছি। আমার এক বন্ধু ছোটবেলায় ১৩/১৪ বছর বয়স অবধি রাতে বিছানায় প্রস্রাব করতো। বহু allopathy ডাক্তার দেখিয়েও কোনো ফল না হওয়ায় শেষে রাসবিহারী এভিনিউতে Dr. P. Banerjee-র chamber-এ Dr. A. Chatterjee কে দেখান ওর বাবা মা। সারা জীবনের মত নির্মূল করে দিলো হোমিওপ্যাথি। ছোটবেলায় আমার মুখে খুব ব্রণ হতো। বহু allopathy ডাক্তার দেখিয়ে ছিলাম। সেই সময়কার নামকরা স্কিন specialist Dr. Jadav Chakraborty কেও দেখিয়ে ছিলাম। কম করে একশোটা doxycycline ট্যাবলেট খাইয়েছিলেন। কিছছু হয়নি তাতে। অবশেষে হোমিওপ্যাথি দিয়ে সারা জীবনের মত নির্মূল করে দিলেন একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। অজস্র উদাহরণের মধ্য থেকে কয়েকটা উল্লেখ করলাম মাত্র। সুতরাং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হোমিওপ্যাথির নিন্দে না করে মনে অবিশ্বাস নিয়েই কোনো অসুস্থতা নিয়ে (বিশেষত কোনো chronic রোগ নিয়ে) কোনো হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে যান আমার যথেষ্ট বিশ্বাস আপনার ধারণাটা বদলে যাবে।

      Delete
    3. হ্যাঁ, বিশেষ উদ্দেশ্য তো অবশ্যই আছে: ছদ্মবিজ্ঞান নির্মূল করা।

      ১. শিশুদের মধ্যে প্লাসিবো এফেক্টের সঠিক কার্যকারিতা এখনও গবেষণাধীন, তবে একটি আশাপ্রদ তত্ত্ব রয়েছে: Placebo by Proxy; এই তত্ত্ব অনুসারে, প্লাসিবো এফেক্ট সরাসরি শিশুর পরিবর্তে শিশুর পরিচর্যাকারী মাধ্যমে ঘটতে পারে। যখন পরিচর্যাকারী অভিভাবক বিশ্বাস করেন যে হোমিওপ্যাথি তার শিশুকে রোগমুক্তি দেবে, তখন তারা তাদের প্রতি ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে, আরও যত্ন এবং মনোযোগ প্রদান করে। যত্নশীল আচরণে শিশুর মনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটার মাধ্যমে শিশুর অবস্থার উন্নতি হতে পারে।

      ২. কোনো দাবী বৈজ্ঞানিক প্রমাণিত হতে হলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে এর স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। মাত্র এক-দুই জনের স্যাম্পল সাইজ কোনো ওষুধের ক্লিনিক্যাল ইফেক্ট প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। আপনার সবগুলো দাবী এখানে উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করছি না, পুরো পোস্ট পড়ে থাকলে এই ধরণের দাবী করতেন না। আর যদি পড়ে থাকেন তাহলে আপনার জন্য "সাত কাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ" প্রবাদটি যথোপযুক্ত।

      Delete
  6. নাইমুল আলম18 April 2024 at 23:42

    হোমিওপ্যাথির গুণকীর্তনকারীদের মুখে একেবারে ঝামা ঘষে দিয়েছেন! 😁

    ReplyDelete
  7. বিশ্লেষণধর্মী রচনা।

    ReplyDelete
  8. I never expected Homeopathy to be a form of a "Theology", but the comment section hehehe............

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা