স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা



◾প্রাক-কথন:

ছোট বাচ্চা হোক আর বুড়ো পদার্থবিদ, স্লিঙ্কি সবার কাছেই বেশ জনপ্রিয় একটি খেলনা। স্লিঙ্কি ঝাঁকিয়ে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ তৈরি করা বাচ্চাদের বেশ পছন্দের। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি  পদার্থবিদরাও স্লিঙ্কি নিয়ে বেশ উৎসাহী। স্লিঙ্কি মূলত কয়েক সে.মি. থেকে মিটার অব্দি লম্বা একধরণের স্প্রিং। ১৯৪০ সালের দিকে রিচার্ড জেমস প্রথম স্লিঙ্কি উদ্ভাবন করেন। স্টিলের পাতকে কয়েল আকারে পেঁচিয়ে টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে স্লিঙ্কি তৈরি করা হয়।

মজার ব্যাপার হলো, একটি স্লিঙ্কিকে যদি এক প্রান্তে ধরে এটিকে উল্লম্বভাবে ঝুলিয়ে  ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন এটি কিছুক্ষণের জন্য শূন্যে ভেসে থাকে! মশকরা করছি নাকি সত্যি বলছি সেটা এই ভিডিওটা দেখলেই বুঝতে পারবেন:


ভিডিও: স্লিঙ্কির শুন্যে ভেসে থাকা!


আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, স্লিঙ্কি কীভাবে মহাকর্ষ বলকে উপেক্ষা করে শূন্যে ভেসে রইলো? এই পোস্টে আমরা এই প্রশ্নেরই বিস্তারিত উত্তর খুঁজবো। 


স্লিঙ্কি কেন শূন্যে ভেসে থাকে?: 

একটা স্লিঙ্কিকে যখন এক প্রান্ত ধরে উল্লম্বভাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তখন এটা তার নিজস্ব ওজনের (F=mg) কারনে নিচের দিকে প্রসারিত হয়, প্রতিটি কয়েল বা পাক একে অপরের সাথে যুক্ত ফলে, সবগুলো কয়েল সমভাবে প্রসারিত হতে চায়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে, এই অবস্থায় যদি উপরের প্রান্তটি ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে উপরের প্রান্তটি সম্পূর্ণরুপে নিচে না আসা অব্দি এটা শুন্যে ভেসে থাকে। অন্যভাবে বললে, সম্পূর্ণ স্লিঙ্কি গুটিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটা শুন্যে ভাসবে।

স্লিঙ্কির একপ্রান্ত ধরে ঝুলিয়ে রাখলে স্লিঙ্কি প্রসারিত হয় ফলে এর মধ্যে হুকের সূত্রানুসারে মহাকর্ষ বলের বিপরীতমুখী টান-বলের উৎপত্তি হয়। স্লিঙ্কি ছেড়ে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই টান-বল ও মহাকর্ষ বল সাম্যাবস্থায় থাকে। ফলে নিট ত্বরণ হয় 0। কিন্তু, যখনই স্লিঙ্কি ছেড়ে দেওয়া হয় এই সাম্যাবস্থা ভেঙে যাওয়া শুরু হয়। স্লিঙ্কির ক্ষেত্রে, তৎক্ষনাৎই সাম্যাবস্থা ভেঙে যায় না। সময় লাগে। স্লিঙ্কি ছেড়ে দেওয়ার সাথে-সাথে এর উপরের কয়েল বা পাকগুলোতে টানবল হারিয়ে যায় (নিচের অংশে তখনও এই টানবল রয়ে যায়)। হঠাৎ করে উপরের অংশে টানবল হারিয়ে যাওয়ায় উপরের অংশটুকু সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি কয়েল গুটিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নিচের দিকে তরঙ্গের ন্যায় অগ্রসর হয় (ভিডিওটি দেখুন)। 

এই তরঙ্গের বেগের মান, v= √(Y / ρ)

যেখানে, Y= ইয়াংস মডুলাস, ρ=স্লিঙ্কি যে পদার্থ দিয়ে তৈরি তার ঘনত্ব। 

পুরো তরঙ্গটা একেবারে নিচে নেমে আসতে অর্থাৎ, টানবল শুন্য হতে প্রয়োজনীয় সময়, Δt = L / v

যেখানে, L=স্লিঙ্কির দৈর্ঘ্য এবং v=স্লিঙ্কিতে উৎপন্ন ঐ তরঙ্গের বেগ।

স্লিঙ্কিকে নির্দিষ্ট সময় ভেসে থাকতে দেখা যায় কারন, Δt সময় অতিবাহিত হওয়া অব্দি স্লিঙ্কির  প্রসারণের কারনে উৎপন্ন টানবল ও মহাকর্ষ বল পরস্পরকে কাটাকাটি করে দেয়। ঝোলানো অবস্থা থেকে ছেড়ে দিলে উপরের অংশে টানবল 0 হতে শুরু করে এবং পুরো স্লিঙ্কির প্রতিটি কয়েলের টানবল 0 হয়ে স্লিঙ্কি গুটিয়ে যেতে Δt পরিমাণ সময় লাগে। টানবল 0 হওয়া মানে মহাকর্ষের বিপরীতে বল ক্রিয়াশীল না থাকা। পুরো স্লিঙ্কি গুটিয়ে যাওয়ার পরপরই সাম্যাবস্থা ভেঙে স্লিঙ্কি 9.8 m/s2 অভিকর্ষজ ত্বরণে নিচে পড়ে যায়। আবার, Δt সময়েই আমরা স্লিঙ্কিটিকে শুন্যে ভেসে থাকতে দেখি। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় স্লিঙ্কি শুন্যে ভাসমান। সাধারণত এই সময়টা অনেক কম ফলে স্লো মোশন ক্যামেরা ছাড়া এই ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করা দুস্কর।


◾উপসংহার: 

স্লিঙ্কির শুন্যে ভেসে থাকার ঘটনা অতিপ্রাকৃত কিছুই নয় বরং এটা প্রমাণ করে যে মহাকর্ষ সত্যিকার অর্থেই বল। কতিপয় কন্সপিরেসি থিওরিস্ট স্লিঙ্কির ভেসে থাকার ঘটনার কথা বলে পদার্থবিজ্ঞানকেই নাকচ করতে চায় অথচ স্লিঙ্কির ভেসে থাকার কারন পদার্থবিজ্ঞানেই নিহিত। 

ভিডিও কৃতজ্ঞতা : অ্যাডাম শোমস্কি।

© Naturalist's View

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?