বাতাসের চাপ সমাচার
◾শুরুর কথা:
প্রাচীনকালে বাতাসকে বস্তু মনে করা হতো না। গ্রীক যুগে দার্শনিক এম্পেডোক্লিস (৪৯০-৪৩০ খ্রি:পূর্ব) পানিতে একটি বালতি উল্টো করে রেখেছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন যে পানি ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না, এইভাবে বাতাসকে একটি "বস্তু" হিসাবে তিনি চিহ্নিত করতে সমর্থ হন যা বালতিটি পূরণ করছে। কিন্তু তিনি যখন পানিপূর্ণ বালতিকে ওঠাবার চেষ্টা করেন তখন দেখতে পান বালতিটি ওপরে উঠাতে বেশি বল প্রয়োগ করতে হচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে সেটার কোনো কূলকিনারা করতে ব্যর্থ হন তিনি। সমস্যা নেই এ বিষয়ে একটু পরেই বলব। যাহোক, কাল এগিয়ে চলল, নতুন নতুন দার্শনিকদের জন্ম হলো, সবাই সমস্যাটার সমাধানে মনোযোগী হলেন তবে কেউই সঠিক কিছু বলতে পারলেন না। এরিস্টটল বাতাসকে উষ্ণ এবং আর্দ্র বলে বর্ণনা করেছেন। প্লেটো মনে করতেন, বিভিন্ন ধরনের বাতাস আছে, সবচেয়ে উজ্জ্বল হল Aether যা মেঘের কাছাকাছি থাকে এবং সবচেয়ে নিচে মাটির কাছে থাকে Aer যা কিনা কুয়াশাচ্ছন্ন।
◾পট পরিবর্তনের সূচনা:
এরই মাঝে রেনেসাঁস এসে পরলো। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপে জ্ঞান চর্চার সূর্য স্তিমিত থাকার পর অবশেষে সেই অন্ধকার কাটতে শুরু করল। জিওর্দানো ব্রুনো, টাইকো ব্রাহে, ইবনে রুশদ প্রমুখের কল্যাণে জ্ঞান চর্চার নতুন জোয়ার আসা শুরু করল। এরই মধ্যে ১৫৬৪ সালে মহান পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি জন্মগ্রহণ করলেন। একটা ''প্যারাডাইম শিফ্ট" ঘটতে শুরু করল। গ্যালিলিও তখন কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মডেলের কিছু ত্রুটি সংশোধন করে একটা বই লিখলেন, কোথায় সবাই সেই বই পড়ে তাঁর উপস্থিত করা প্রমাণাদি গুলো যাচাই করবে কিন্তু বিধি বাম। রোমান ক্যাথলিক গেলো ক্ষেপে, সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত— এই মত পোষণ করায় গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী করা হলো, তবে এতেও তিনি দমে যাননি। তিনি তার লেখা সর্বশেষ পুস্তক, "Discourses Concerning Two New Sciences " প্রকাশ করলেন তবে ইতালিতে নয়, তিনি বইটা প্রকাশনার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠালেন।
চিত্র ১: গ্যালিলিওর বিখ্যাত বই, "Discourse Concerning Two New Sciences"।
◾বাতাসের ভর এবং শূণ্যস্থান:
বইটা যথারীতি নেদারল্যান্ডসে প্রকাশিত হয়, সেখানের জ্ঞানী-গুণীজনের কাছে অল্প ক'দিনেই সমাদর লাভ করে। এ পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে, বাতাস থেকে সরাসরি গ্যালিলিওতে কেন আসলাম, বলছি তবে...। গ্যালিলিওর সেই বইটা ছিলো তার সকল কাজের সংকলন। বইটাতে তিনি পড়ন্ত বস্তুর সূত্র এবং বস্তুর বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করেন। বইটার একাংশে তিনি সেই বাতাস সংক্রান্ত সমস্যাটার (ওই যে পানিতে উপুর করে ডোবানো বালতি উঠাতে এম্পেডোক্লিসের বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল…) একটি সমাধান দিয়েছিলেন। তিনি বাতাসের ভর আছে কিনা এ বিষয়ে একটা পরীক্ষার কথা বর্ণনা করেন। তিনি একটা বোতলে বিপুল চাপে কিছু বাতাস ভরেন এবং একটা নিক্তিতে একই ভরের বাটখারা রাখেন। তারপর তিনি বোতলের ঢাকনা খুলে দেন এবং দেখা যায় এর ফলে নিক্তিটার ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে গেছে, অর্থাৎ প্রমাণিত হয় যে বাতাসের ভর আছে। এবং এই ভর থাকাকে আশ্রয়বাক্য ধরে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে যখন মুখ দিয়ে কোনো তরল চোষা হয় কিংবা খালি বালতি পানিপূর্ণ করা হয় তখন ওখানে যে শূণ্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হয়, সেই ভ্যাকুয়ামে অদৃশ্য শক্তি বিদ্যমান যা তরল ওপরে তোলার মতো কাজ করতে পারে।
চিত্র ২: বিজ্ঞানী টরিসেলীর পোর্ট্রেট।
এদিকে, নেদারল্যান্ডসে টরিসেলী (১৬০৮-১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) নামক আরেকজন বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর বইটা পড়ে এই বিষয়ে এক ধরণের "আইডিয়া" পান। তবে তিনি গ্যালিলিওর সেই "শূন্যস্থানের অদ্ভুত শক্তির অস্তিত্ব” মানতে পারেননি। তিনি সমস্যা সমাধানের নতুন উপায় খুঁজতে থাকলেন। অবশেষে একদিন তার মাথায় বাতি জ্বলল, তিনি একটা পরীক্ষার ব্যাবস্থা করলেন।
চিত্র ৩: টরিসেলীর পরীক্ষার স্কেচ।
তিনি ১৬৪৩ সালে একটা অনেক লম্বা কাচনলে পারদ পূর্ণ করেন এবং আরেকটা পারদ পূর্ণ পাত্রে সেটাকে উল্টো করে রাখলেন। দেখা গেল পারদ নামতে নামতে ৭৬ সে.মি. উচ্চতায় পৌঁছবার পরে আর নামছে না (নিচের চিত্র ৪ দ্রষ্টব্য)। তিনি এবার আরেকটা নল নিলেন তবে এটার গোড়া অনেক মোটা, গোলতলী ফ্লাস্কের মতোন। তিনি পূর্বের ন্যায় কাজ করলেন। তার অনুকল্প ছিলো, যদি গ্যালিলিওর কথা সত্যি হয় তাহলে ওই প্রথম কাচনলটাতে পারদ যতটুকু উচ্চতায় এসে আর নামছে না, মোটা গোড়ার কাচনলে সেই উচ্চতা থেকে আরো বেশি উচ্চতায় পারদ নামা বন্ধ হবে। কারন গ্যালিলিওর অনুকল্প অনুসারে শূণ্যস্থানেই শক্তি বিদ্যমান, আর স্বাভাবিকভাবেই শুন্যস্থান বেশি হলে শক্তির মান হবে বেশি এবং পারদ নামা বন্ধ হবে আরেকটু বেশি উচ্চতায়। কিন্তু পরীক্ষা শেষে দেখা গেল উভয় নলেই একই উচ্চতায় পারদ নামা বন্ধ হয়েছে। অনেক চিন্তা ভাবনার পরে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌছলেন যে বাতাসের চাপের কারণেই মূলত পারদ ওই উচ্চতায় আটকে গেছে। উল্লেখ্য টরিসেলীর শূণ্যস্থান প্রকৃতপক্ষে শূণ্য নয়, এতে পারদ বাষ্প বিদ্যমান।
◾বাতাসের চাপ জিনিসটা কী?
বাতাসের চাপ নিয়ে বলার আগে চাপ কী সেটা বলা প্রয়োজন। প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যতটুকু বল প্রয়োগ করা হয় তাই চাপ। এই চাপের পরিমাণ নির্ভর করে বল ও ক্ষেত্রফলের মানের উপর। কোনো জায়গায় আপনি হাত দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছেন- মানে আপনি ওই জায়গাটুকুতে চাপ প্রয়োগ করছেন।
নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র অনুসারে যেকোনো বস্তুই পরস্পরকে একটা বলে আকর্ষণ করে, এই বলের মান নির্ভর করে বস্তুর ভর ও তাদের মধ্যকার দুরত্বের ওপর। বাতাসের ভর আছে তাই এটা পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে আকর্ষিত হয়, ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠের সকল কিছু এই বাতাসের উপর বিদ্যমান আকর্ষণ বলের কারণে একটা চাপ অনুভব করে। তবে, বায়ুচাপ ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে না। যদি তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকত, তাহলে নির্দিষ্ট উচ্চতায় সকল বিন্দুতে সমপরিমাণ বায়ু চাপ অনুভূত হতো।
উল্লেখ্য, পৃথিবী পৃষ্ঠের যত ওপরে যাওয়া যায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক হারে কমতে থাকে, ফলে সেখানে বাতাসের পরিমাণ কমে এবং বায়ুচাপ কমে যায় (কমেন্ট সেকশনে চিত্র ২ দেখুন)। পাহাড়ে ওঠার সময় সাথে করে অক্সিজেন নিয়ে যেতে হয় কারণ বায়ুর পরিমাণ কম থাকায় সেখানে অক্সিজেনও কমে যায়।
এই পর্যায়ে বায়ু চাপ কতটা শক্তিশালী সেটার একটা উদাহরণ দেয়া দরকার। ১৬৫৭ সালের দিকে বিজ্ঞানী ভন গুয়েরিক দুটো বড় কিন্তু পাতিলের মতো ফাঁপা অর্ধ গোলক বানালেন এবং উভয়কে বায়ুশূন্য করে একে অপরের সাথে আটকে দেন। এরপর দুদিক থেকে টেনে উভয়কে আলাদা করার জন্য মোট ৩২ টা ঘোড়া লেগেছিল! বুঝুন তাহলে, বায়ু চাপ ছেলের হাতের মোয়া না কিন্তু।
◾বায়ুমন্ডলীয় চাপ কেন টরিসেলীর পরীক্ষার পারদের উচ্চতার তারতম্য ঘটায়:
বাতাস একটা প্রবাহী, তাই এটা সব দিক থেকেই চাপ প্রয়োগ করে। একারণে দেখবেন খালি বোতলে চুমুক দিলে এটা সব জায়গা থেকে সংকুচিত হয়। টরিসেলীর পরীক্ষায়ও একই ব্যাপার ঘটেছে। বাতাস পারদ স্তম্ভকে নিচ থেকে চাপ প্রয়োগ করেছে বলে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় (সাধারণত ৭৬ সেমি) পারদ থেমে গেছে। এখানে পারদ স্তম্ভের প্রয়োগকৃত চাপ এবং যে পাত্রের উপর কাচনলখানা উপুড় করা হয়েছে সেই পাত্রে থাকা পারদের উপর বাতাসের প্রয়োগকৃত চাপ সমান হয়ে যাওয়ায় ৭৬ সেমি উচ্চতায় এসে থেমে গেছে। তবে বাতাসের চাপের পরিবর্তন হলে এই উচ্চতার তারতম্য হয়।
চিত্র ৩: টরিসেলীর পরীক্ষা।
আর এই তারতম্য পরিমাপ করে বাতাসের চাপ মাপা সম্ভব। পারদস্তম্ভের ৭৬ সেমি থেকে উচ্চতা বেড়ে যাওয়া মানে বায়ুচাপ বেড়ে যাওয়া আর উচ্চতা কমে যাওয়া মানে বায়ু চাপ কমা। এই নীতি ব্যারোমিটারে আজ অব্দি ব্যবহার করা হচ্ছে বায়ু চাপ মাপার জন্য।
চিত্র ৫: ব্যারোমিটার।
যদি পারদের বদলে পানি ব্যবহার করি তাহলে কী হবে? তাহলে এই পরীক্ষায় পানি ১০.৩ মিটার উচ্চতায় থেমে যেত কারণ পারদের তুলনায় পানির ঘনত্ব কম, কাজেই নির্দিষ্ট উচ্চতায় স্থির থাকতে, বাতাসের চাপের সমপরিমাণ চাপ প্রয়োগের জন্য আরো বেশি পরিমাণ পানি লাগবে, ফলে পানি থেমে যাওয়ার পয়েন্টের উচ্চতাও বেশি হবে।
টরিসেলীর এই পরীক্ষার মতোই আরো একটা পরীক্ষার কথা বলা দরকার। একটা গ্লাস সম্পূর্ণভাবে পানি দ্বারা পূর্ণ করে গ্লাসের ওপর একটা কার্ড এমনভাবে লাগিয়ে দিন যাতে ওই কার্ডটা আটকে যায়, এবার গ্লাসটা কার্ডসহ উল্টো করুন— দেখবেন কার্ডটা খসে পানি পড়ছে না। কারণ বাতাস গ্লাসের নিচ থেকে ওপরের দিকে চাপ দিচ্ছে, এই কারণে এম্পেডোক্লিসকে পানিতে উপুর করা বালতি উঠাতে বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়েছিল। স্ট্র দিয়ে জুস খাবার সময় মুখের মধ্যে শূণ্যতা তৈরি হয়, ফলে বাতাস পাত্রের জুসের উপরিতলে চাপ প্রয়োগ করে এবং তরল স্ট্র বেয়ে মুখে পৌঁছে যায়।
◾বাতাসের চাপ ও আবহাওয়ার সম্পর্ক:
বাতাসের চাপ ও আবহাওয়া নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। পৃথিবী পৃষ্ঠে এক স্থানে বাতাসের চাপ বেশি থাকলে এবং অন্য স্থানে বাতাসের চাপ কম থাকলে বাতাস উচ্চ চাপের স্থান থেকে নিম্নচাপের স্থানে প্রবাহিত হবে। এই বাতাসের চাপের পার্থক্যটা হয় তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে। কোথাও তাপমাত্রা বেশি থাকলে সেখানকার বাতাস প্রসারিত হয়ে এর ঘনত্ব কমে যায়, ফলে সেখানে বায়ুচাপ কমে। আবার কোথাও তাপমাত্রা কম থাকলে সেখানকার বাতাস সংকুচিত হয় এবং ঘনত্ব বেড়ে যায়, ফলে সেখানে বায়ু চাপ বাড়ে। বায়ু চাপের এই পার্থক্যের কারণে বাতাস উচ্চ চাপের স্থান থেকে নিম্নচাপের স্থানে ধাবিত হবে। এই কারণেই বায়ু প্রবাহ সৃষ্টি হয়। বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে।
জলীয়বাষ্প বা পানির আণবিক ভর হলো ১৮, আর বাতাসের মূল উপাদান নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের মোট আণবিক ভর ৩২+২৮=৬০। কোনো স্থানে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো জলীয় বাষ্প ভারী অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসকে সরিয়ে জায়গা দখল করেছে, এতে বাতাসের ঘনত্ব কমে যায় এবং বায়ু চাপ কমে যায়। ব্যারোমিটারে যদি দেখা যায় চাপ কম তাহলে বুঝতে হবে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশী, জলীয় বাষ্প বেশী তথা আপেক্ষিক আদ্রতা বেশি হওয়া মানে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। আর ব্যারোমিটারে চাপ বেশি দেখা যাওয়া মানে সেখানকার বাতাসে জলীয় বাষ্প কম এবং ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনাও খুব একটা নেই।
◾আমরা সচরাচর বায়ুর উপস্থিতি এবং বায়ু চাপ টের পাই না কেন:
এটা আশ্চর্যের যে অতীতে মানুষ বাতাসের অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন ছিলো না। বিষয়টা মেনে নেওয়া কঠিন, কারণ আমরা হরহামেশাই বাতাসের প্রবাহ দেখে নিশ্চিত হই যে বাতাস আছে। আসলে বাতাসের বস্তুগত অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ জানতো না তখন, ঠিক যেভাবে পানিতে থাকা মাছ জলাশয়ের পানির অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন নয়। এজন্য বাতাসের অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে এই চিন্তা তাদের মাথায় আসেনি তখন। ফলে, বাতাসের বস্তুগত উপস্থিতি টের না পাওয়াই স্বাভাবিক।
আমরা কেন বায়ু চাপ টের পাইনা, এর উত্তরও জটিল নয়। আমাদের শরীর বাতাস যে পরিমাণ চাপ প্রয়োগ করে তার সমান চাপ বিপরীত দিকে প্রয়োগ করে, ফলে উভয়ে বাতিল হয়ে যায়। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ এই বিষয়টা মোকাবেলা করার উপযোগী হয়েই বিবর্তিত। আবার সমুদ্রের অতল গভীরে চাপ ভূপৃষ্ঠ থেকে বেশী হওয়ায় সেখানকার প্রাণীগুলোর শরীরের ঘনত্ব কম যাতে চাপীয় সমস্যার মোকাবেলা করে তারা টিকে থাকতে সক্ষম হয়। এভল্যুশন ফাইন্ডস ইটস ওউন ওয়েস।
◾স্পেসস্যুট ছাড়া মহাকাশে গেলে কী ঘটবে:
ধরা যাক, আপনি স্পেসস্যুট ছাড়াই মহাকশে গেলেন। কী হতে পারে বলুনতো? মহাকাশে কোনো বাতাস নেই, কাজেই বায়ু চাপ থাকার প্রশ্নই আসে না। পৃথিবীতে মানবদেহ বায়ুচাপের সমপরিমাণ চাপ প্রয়োগ করে বায়ু চাপকে কাটাকাটি করে দিত ফলে দেহ স্টেবল থাকত। মহাকাশে বায়ু চাপ না থাকায় মানবদেহের এই বহির্মুখী চাপকে আটকানো সম্ভব হবে না, ফলে এরকম মনে হতে পারে যে দেহ বিস্ফোরিত হবে, কিন্তু এরকমটা আসলে ঘটবে না, কারন মানবদেহের চামড়া এবং কোষগুলো পরষ্পরের সাথে বেশ আঁটোসাটোভাবে যুক্ত। এতো সহজে এদের আলাদা করা সম্ভব নয়। কাজেই নাক দিয়ে রক্ত পড়া, বমি করা ও শ্বাসকষ্টে মারা যাওয়া ছাড়া আর কিছুই ঘটবে না।
আরেকটা ব্যাপার, আপনি কোনোভাবে সেখানে একটা একমুখ বন্ধ নল মুখ দিয়ে চোষা শুরু করলেন (কল্পনা করতে কী সমস্যা?), পৃথিবীতে থাকলে এতক্ষণে সেটা আপনার মুখের সাথে আটকে যেত। কিন্তু মহাকাশে বায়ুচাপ না থাকায় সেটা হবে না, যত চেষ্টাই করেন আটকাবে না।
◾স্ফুটনাঙ্ক ও বায়ু চাপের সম্পর্ক:
চাপ বাড়লে স্ফুটনাঙ্ক বাড়ে আর চাপ কমলে স্ফুটনাঙ্ক কমে। স্বাভাবিক তথা ১ বায়ুমন্ডলীয় চাপে পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ °সে.। বায়ু চাপ যদি না থাকে তাহলে পানি যেকোনো তাপমাত্রায় বাষ্পীভূত হতে পারে, যেমন মহাশূণ্যে ১ গ্লাস পানি রাখলে সেটা মূহুর্তে বাষ্প হয়ে যাবে। আবার, বায়ু চাপ বাড়লে স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে যায়। প্রতি ২.৭ সে.মি. পারদ চাপের পার্থক্যের জন্য স্ফুটনাঙ্কের পার্থক্য হয় ১°সে.। পাহাড়ের উচ্চতা বেশি হওয়ায় সেখানে বায়ু চাপ কম, ফলে সেখানে অল্প তাপেই পানি বাষ্পীভূত হয়। এভারেস্টের চূড়ায় পানি মাত্র ৭০°সে. এ বাষ্পীভূত হয়।
এই নিয়ে ফ্রাঙ্কলিনের একটা পরীক্ষণ রয়েছে। একটা গোলতলী ফ্লাস্ক নিয়ে তাতে পানি নিয়ে ফোটানোর পরে ভেতরে থার্মোমিটার ঢুকিয়ে ছিপি দিয়ে আটকে দিয়ে ফ্লাস্কটাকে একটা ত্রিপদী স্ট্যান্ডে উল্টিয়ে রাখা হলো। এরপর, উল্টানো ফ্লাস্কের গায়ে বাইরে থেকে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলে দেখা যাবে তাপ প্রয়োগ না করা সত্ত্বেও পানি ফুটতে শুরু করেছে! ফ্লাস্কে তাপ প্রয়োগের ফলে এর ভেতর থেকে সকল বাতাস বের হয়ে যায় এবং ভেতরে শুধু জলীয়বাষ্প থাকে। বাইরে থেকে ঠান্ডা পানি ঢালায় ভেতরের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে পানিতে পরিণত হয় এবং ভেতরে জলীয় বাষ্পের চাপ কমে যায়, ফলে ভেতরের পানি ১০০°সে. এর কম তাপমাত্রাতেই ফুটতে শুরু করে।
চিত্র ৬: ফ্র্যাঙ্কলিনের পরীক্ষা।
অর্থাৎ, এটা প্রমাণিত হয় যে চাপ বাড়লে স্ফুটনাঙ্ক বাড়ে আর চাপ কমলে স্ফুটনাঙ্ক কমে। এই নীতি ব্যবহার করে প্রেশার কুকারের ভেতরে জলীয়বাষ্প দিয়ে চাপ বাড়ানো হয়। ফলে, এর মধ্যে পানির স্ফুটনাঙ্ক ১২০°সে এ উন্নীত হয়, এই উচ্চ তাপে রান্না হয় আরো দ্রুতভাবে।
তথ্যসূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, পিবিএস.অর্গ।
©️ Naturalist's View

.jpg)
.jpg)



Comments
Post a Comment