একাগ্রচিত্তে কাজ করার সময় অনেকে অবচেতনে মনেই জিহ্বা বের করে রাখে কেন?
◾শুরুর কথা:
আপনি মাঝেমধ্যে দেখে থাকবেন যে কিছু মানুষ কোনো কাজ মনোযোগ দিয়ে করার সময় জিহ্বা বের করে উপরের ঠোঁটের সাথে লাগিয়ে রাখে। তারা জানেও না যে জিহ্বা ঠোঁটের সাথে লেগে রয়েছে। হয়তো আপনার ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটেছে। তবে, এই বিষয়টা বেশি দেখা যায় শিশুদের বেলায়। কোনো কিছু লেখার সময় প্রায়ই তাদের জিহ্বা ঠোঁটের সাথে লেগে থাকে। আপনি হয়তো এ নিয়ে আর মাথা ঘামাননি। ঘটনাটি খুব সাধারণ মনে হলেও এটা ঘটার কারণ অত্যন্ত জটিল। প্রিয় পাঠক, চলুন খুঁজে বের করি এই ঘটনার প্রকৃত কারণ।
◾মোটর ওভারফ্লো:
আমরা কোনো কাজ করার সময় মনের অগোচরে কেন জিহ্বা বের করি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয় মোটর ওভারফ্লো তত্ত্বের মাধ্যমে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজিতে প্রকাশিত 2019 সালের একটি সমীক্ষা [১] অনুসারে মস্তিষ্কের ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চল (লোয়ার ফ্রন্টাল গাইরাসে অবস্থিত) মোটর দক্ষতা (হাত পা নাড়ানোর তথা পেশি সঞ্চালনের ক্ষমতা) এবং যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য নিবেদিত নিউরাল নেটওয়ার্কগুলির সাথে ওভারল্যাপ করেছে । মোটর ওভারফ্লো তত্ত্বানুসারে, মস্তিষ্কের যে অঞ্চল সরঞ্জাম ব্যবহার এবং দক্ষতার জন্য দায়ী সেই অঞ্চলের নিউরনগুলি এতটাই সক্রিয় যে তারা পার্শ্ববর্তী নিউরাল টিস্যুগুলোতে 'ওভার ফ্লো' করে (মস্তিষ্কের এই অঞ্চল কথা বলতে সাহায্য করে)। উপমাস্বরুপ বলা যায়, এরফলে মোটর দক্ষতা এবং ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলের মধ্যে শর্টসার্কিট হয়ে যায়। অতএব, যখন আপনি একটি সূক্ষ্ম-মোটর টাস্কে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন, তখন এই প্রভাবটি মস্তিষ্কের ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে একারণে আপনার অবচেতনেই মুখ এবং জিহ্বা সচল থাকে।
◾মোটর ওভারফ্লো যেভাবে হয়:
যেখানে এধরণের শর্ট সার্কিট ঘটতে পারে তা চিহ্নিত করার জন্য জিহ্বা এবং হাত নিয়ন্ত্রণের নিউরাল অ্যানাটমি ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায় যে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্নায়ু দ্বারা এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়। জিহ্বা ক্র্যানিয়াল স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু হাতগুলি মেরুদণ্ডের স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ক্র্যানিয়াল স্নায়ুগুলি মস্তিষ্কের সাথে সরাসরি সংযোগ করে, প্রতিটি স্নায়ু একটি নির্দিষ্ট সংবেদন মোটর ফাংশন বহন করে। যেমন, প্রথম ক্র্যানিয়াল নার্ভ, গন্ধের অনুভূতি প্রকাশ করে। জিহ্বা 12 তম ক্র্যানিয়াল স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যাকে হাইপোগ্লোসাল নার্ভ বলা হয়। বিপরীতে, আমাদের শরীরের অন্যান্য পেশীগুলির মতো আমাদের হাতের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী পেশীগুলি আমাদের মেরুদন্ড থেকে বেরিয়ে আসা স্নায়ু থেকে নির্দেশনা পায়, আমাদের মেরুদণ্ডের মধ্যে তাদের পথ সংযুক্ত হয়। সংবেদনশীল সংকেত বিপরীত দিকে যাত্রা করে। স্পষ্টতই, জিহ্বা এবং মোটর দক্ষতার অঞ্চলের মধ্যে শর্ট সার্কিট (কিংবা ওভারল্যাপিং) অবশ্যই মস্তিষ্কের ভিতরে এই দুটি স্নায়ুর মিলনস্থলে উদ্ভূত হবে। এবং এই বিষয়টি একটি গবেষণায় প্রমাণিতও হয়েছে [২]। গবেষকরা গত এক দশকে দেখিয়েছেন যে আমাদের সংবেদনশীল আঙুল এবং জিহ্বা থেকে স্পর্শকাতর সংবেদনগুলি প্রায়শই আমাদের মস্তিষ্কে এমনভাবে একত্রিত হয় যা এর কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
◾মোটর ওভারফ্লো আমাদের মধ্যে যেভাবে আসলো:
আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জিহ্বা ও মোটর দক্ষতার এই সমন্বয় কোথা থেকে এসেছে? এটি সম্ভবত আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের হাতে-মুখে খাওয়ানোর আন্দোলন এবং তাদের ভাষার বিকাশে উদ্ভূত হয়েছিল, কারণ ভাষা সাধারণত হাতের নড়াচড়ার সাথে সম্পর্কিত। সম্ভবত, হাতের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রাথমিক যোগাযোগের বিকাশ ঘটেছিল এবং আমাদের পূর্বপুরুষ প্রজাতি ধীরে ধীরে উপযুক্ত সিলেবিক উচ্চারণগুলির সাথে এই অঙ্গভঙ্গিগুলোকে মিশ্রিত করেছিল [৩]। প্রকৃতপক্ষে, নিউরোইমেজিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তসমূহ দেখায় যে জিহ্বা এবং হাতের নড়াচড়া প্রি-মোটর কর্টেক্সে (F5 অঞ্চল) মস্তিষ্কের একই অঞ্চলকে সক্রিয় করে। একইভাবে, একটি বানর যখন তার মুখ বা তার হাত দিয়ে একটি বস্তু আঁকড়ে ধরে তখন প্রি-মোটর অঞ্চলের নিউরনগুলি ফায়ার করে [৪]। বানরের ক্ষেত্রেও মানুষের মতো প্রায় একই ঘটনা ঘটে। এই বৈশিষ্ট্য মূলত একপ্রকার বিবর্তনীয় অবশেষ (ভেস্টেজিয়ালিটি)। এই বিষয়টি আরেকবার প্রমাণ করে মানুষ এবং হোমিনিড গোত্রের প্রাণীরা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের মধ্যে অ্যানসেস্ট্রিয়াল সম্পর্ক বর্তমান।
◾জিহ্বা বের করার এই বিষয়টি ছোট বাচ্চাদের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়:
২০১৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৪ বছর বয়সীরা জিহ্বা অধিক হারে বের করে । এর কারণ হল মনোযোগসহকারে করা কাজগুলি প্রায়শই ডান হাত দিয়ে করা হয় যা বাম হেমিস্ফিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
রেফারেন্স:
[১] https://www.frontiersin.org/articles/10.3389/fpsyg.2019.01639/full
[২] https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0053061
[৩] https://doi.org/10.1016/j.cognition.2015.04.012
©️ Naturalist's View

Comments
Post a Comment