প্রকৃতিতে মাইক্রো-এভল্যুশন পর্যবেক্ষণ
অনেকে বিবর্তন তত্ত্ব সম্পর্কে বলেন যে, সব প্রাণীই যদি বিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তি হয়েই থাকে তবে এখন বিবর্তন হচ্ছে না কেন? এই ধরনের প্রশ্ন আসলে অবান্তর কারণ বিবর্তন একটি ধীরজ কিন্তু চলমান প্রক্রিয়া। একজন মানুষের পক্ষে তার জীবদ্দশায় শুধুমাত্র সেসকল প্রাণীরই বিবর্তন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব যাদের জীবনচক্র ক্ষুদ্র, যেমন বিজ্ঞানীরা ড্রোসোফিলা মাছির মধ্যে প্রজনন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিভিন্ন আনকোরা প্রজাতির সৃষ্টি করেছেন, করছেন। সম্প্রতি যে করোনা ভাইরাস ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল তার জন্যও দায়ী ডারউইনের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ যা বিবর্তন সংগঠিত হওয়ার অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়া।
এই ব্লগে প্রকৃতিতে চলমান বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া চেরনোবিল অঞ্চলের Hyla orientalis প্রজাতির ব্যাঙের পপুলেশনে নির্দিষ্ট "ট্রেইট" ফিক্সেশনের ঘটনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হবে।
১.
চেরনোবিল। শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে ১৯৮৬ সালের পৃথিবীর সবচে’ বড় পারমানবিক চুল্লির দুর্ঘটনার কথা। আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে দুর্ঘটনাটি ঘটলেও এর চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। এখনো সেখানে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বিদ্যমান। চেরনোবিল অঞ্চলে একধরনের ব্যাঙ পাওয়া যায়, এরা গাছে বাস করে, বৈজ্ঞানিক নাম : "Hyla orientalis"। চেরনোবিলে নিউক্লিয়ার রিয়াক্টরের মেল্টডাউনের আগ পর্যন্ত সেখানে কালো রঙের ‘'Hyla orientalis'' খুব কমই পাওয়া যেত, অনেক বেশি পরিমাণে ছিল সবুজ রঙের ''Hyla orientalis''। কিন্তু দুর্ঘটনার কয়েক দশক পরে দেখা গেলো, সবুজ ''Hyla orientalis'' এর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি পরিমাণে কালো ''Hyla orientalis'' পাওয়া যাচ্ছে। এতো বছরে কী এমন পরিবর্তন হলো যে সবুজ এর বদলে কালো ''Hyla orientalis'' বেড়ে গেলো? কারণ জানতে বিজ্ঞানীরা কোমড় বেঁধে নেমে পড়লেন। শেষমেশ কারণ কী পাওয়া গেল জানেন? ঠিকই ধরেছেন, এখানে বিবর্তন ঘটেছে।
২.
দুই স্প্যানিশ গবেষক, পাবলো বুরাকো এবং জার্মান ওরিজাওলা , কিছু মাস আগে Scientific Reports জার্নালে [১] একটি গবেষণাপত্র লিখেন (পরবর্তীতে আবার Evolutionary Application জার্নালে [২] একই বিষয়ে আরো কয়েকজন গবেষকের সাথে যৌথভাবে আরেকটি গবেষণাপত্র লিখেন)। তারা সেই গবেষণাপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন কীভাবে এই অসাধারণ ঘটনাটি ঘটেছে। কিভাবে কী হলো তা জানার আগে জানা দরকার বিবর্তন কেন ঘটে?
মূলত বিবর্তন হচ্ছে এমন একটি জীববৈজ্ঞানিক ধারণা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যৌন প্রজননের সময় গ্যামেটিক সেলের (অযৌন প্রজননকারী জীবের ক্ষেত্রে মিউটেশন ঘটে অন্যভাবে) জিনোমে সংগঠিত মিউটেশনের কারণে উদ্ভুত জীবের গাঠনিক ও চারিত্রিক ট্রেইট বা বৈশিষ্ট্যের ক্রমপরিবর্তনকে বুঝায়। বৈশিষ্ট্যসমূহ জীবের জন্য অনূকূল হলে জীব বেঁচে থাকে এবং সেই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চার করে, এবং আস্তে আস্তে ওই পপুলেশনে ওই বৈশিষ্ট্য ফিক্সড হয়ে যায় মানে সবার মধ্যেই ওই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তন বিভিন্ন উপায়ে ঘটে তন্মধ্যে প্রধান হচ্ছে পরিবেশের পরিবর্তন। ধরুন, এক জায়গায় অনেকগুলো গিরগিটি ছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই কালো রঙের আর বাকিগুলো ধূসর, গাছে থাকলে ধূসড়গুলোকে কে দেখাই যায় না কিন্তু কালোগুলোকে স্পষ্ট দেখা যায়। হঠাৎ ওই এলাকায় অনেকগুলো সাপ এলো যারা গিরগিটি খেতে পছন্দ করে, তবে সাপগুলো ধূসর গিরগিটিগুলোকে সহজে দেখতেই পায় না কিন্তু কালো গিরগিটিগুলোকে ভালো করে দেখতে পায়। তারা এক এক করে কালো গিরগিটিগুলোকে সাবাড় করা শুরু করলো, ফলে কয়েক প্রজন্ম পরে দেখা যাবে সেখানে ধূসর গিরগিটির সংখ্যা কালো গিরগিটির থেকে বেশি, কারণ ধূসরগুলোকে আর খাবারের জন্য কালোগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে না এবং এভাবে তাদের বংশবিস্তারের হার বেড়ে যাবে ফলে তাদের সংখ্যা বাড়বে। আবার ওই ধূসর গিরগিটিগুলো যদি প্রজননের সময় পর্যন্ত টিকে থাকে তবে তারা যে বাচ্চাগুলো জন্ম দেবে সেগুলোর সবগুলোতো আর কালো হবে না, কিছু ধূসরও জন্ম নিবে (কারণ, জেনেটিক মিউটেশন কিংবা জিনের স্বাধীনভাবে বিন্যস্ত হওয়ার নীতি)। ওই ধূসর বাচ্চাগুলো সন্তান জন্ম দেয়া পর্যন্ত টিকে যাবে এবং এভাবে ধীরে ধীরে ধূসরদের সংখ্যা যাবে বেড়ে (সরলীকৃত)। এবং বিপরীতে কালো গিরগিটির সংখ্যা কমতে থাকবে। তাই ওই জায়গার গিরগিটিগুলোর মধ্যে ধূসর রঙ ফিক্সড হবে অর্থাৎ ধূসর গিরগিটির বিবর্তন ঘটবে। চার্লস ডারউইন মূলত কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো ওই পপুলেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার এই বিষয়টাকেই "প্রাকৃতিক নির্বাচন" বলেছেন।
এখন, চেরনোবিলেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার আগে সেখানে যে সবুজ ব্যাঙগুলো ছিলো সেগুলো দুর্ঘটনার পরের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সহ্য করতে পারে না, ধীরে ধীরে মারা যায়। কিন্তু কালো ব্যাঙগুলো তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মানে কিছুটা নিরাপদ। ফলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একটা শক্তিশালী "নির্বাচনী চাপ" (Selective Pressure) তৈরি করে এবং ব্যাঙের ওই পপুলেশনে কালো পিগমেন্ট তৈরির ট্রেইট ফিক্সড হয়ে যায়।
চেরনোবিলের এক্সক্লুশন জোনের যে অঞ্চলে বিকিরণের মাত্রা বেশি সেই অঞ্চলে পাওয়া ব্যাঙের ত্বক কালো দেখায়। কারণ চামড়া কালো হওয়ার জন্য দায়ী মেলানিন, এই মেলানিন আবার তেজস্ক্রিয় বিকিরণের বিরুদ্ধে কালো ব্যাঙ গুলোকে নিরাপত্তা দেয়। সবুজ ব্যাঙ গুলোর শরীরে মেলানিন কম থাকায় বিকিরণের বিরুদ্ধে সেগুলোর নিরাপত্তা নেই, ফলে প্রজননের আগেই ব্যাটাগুলো পটল তোলে। এতে, কালো ব্যাঙগুলোর খাদ্যের জন্য সবুজ ব্যাঙগুলোর সাথে আর প্রতিযোগিতা করার প্রয়োজন হয় না। এই কারনে, তাদের বংশবিস্তারের হার বাড়ে এবং খুব দ্রুতই সবুজ ব্যাঙগুলোকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে নেয় কালো ব্যাঙগুলো। আবার সবুজগুলোর মাঝে যেগুলো বংশবৃদ্ধির বয়স পর্যন্ত টিকে যায় এবং কদাচিত কালো ব্যাঙ জন্ম দেয় তাহলে কালো বাচ্চাগুলো রেডিয়েশনের প্রভাবে মারা যায় না এবং সেগুলো প্রজনন করা অব্দি টিকে থাকতে সক্ষম হয়। ফলে প্রজন্মান্তরে কালো ব্যাঙের পরিমাণ বেড়ে যায়।
এই ঘটনা প্রকৃতিতে "প্রাকৃতিক নির্বাচন" ঘটার পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ যা পুনরায় স্বাক্ষ্য দেয় যে ডারউইন সঠিক ছিলেন।
◾রেফারেন্স:
[১] Scientific Reports এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রের লিংক: https://www.nature.com/articles/s41598-021-00125-9
[২] Evolutionary Application এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রের লিংক: https://doi.org/10.1111%2Feva.13282
©️ Naturalist's View

Lol. Evolution is scam.
ReplyDeleteWho the fuck told you that, your allah?
Delete🤬
ReplyDelete