জেনেটিক্স: একটুখানি ইতিহাস ও পর্যালোচনা (পর্ব: ০১)

◾প্রাক-কথন:

জেনেটিক্স শব্দটি খুবই সাম্প্রতিক হলেও, এর রয়েছে মস্ত এক ইতিহাস। প্রাচীনকালে অনেক মনীষীগণ এই বিষয়ে তাদের মত দিয়েছেন। কিছুক্ষেত্রে এসব মতের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল, আবার কিছু ক্ষেত্রে ছিল না। জেনেটিক্স বুঝতে হলে এই ধারণাসমূহের সাথে পরিচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।


◾প্রাচীনযুগে বংশগতিবিদ্যা:

আমাদের পূর্বসূরীরা প্রকৃতি সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারণা রাখত না। বলা হয় যে তারা তখন জীব ও জড়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করত না, সবকিছুকেই মনে করত জীবিত। বাতাস, গাছ এমনকি পাথড়কেও তারা জীবিত বলে মনে করত। তারা খেয়াল করেছিল যে কিছু জিনিস বংশবিস্তার করে। মানুষ, পাখি, বানরদের বংশবিস্তার করা দেখে তারা মনে করত জড় পদার্থও বংশবিস্তার করে, তারা ভাবত বড় বড় পাথড় বংশবৃদ্ধি করে ছোট ছোট নুড়়িপাথড়ের জন্ম দেয়! তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই সহজ সরল মানুষগুলো জানতই না যে বংশবৃদ্ধির সাথে নারী-পুরুষ মিলনের সম্পর্ক আছে। গর্ভ হওয়া আর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার নয় মাসের ব্যবধানের জন্যই তারা বিষয়টা জানত না। তবে এই তত্ত্ব আমাদের কিছুটা সংশয় ফেলে, পুরুষরা নাহয় মিলনের সাথে বংশবৃদ্ধির সম্পর্ক খেয়াল করেনি কিন্তু নারীর দেহে যে পরিবর্তন ঘটছে তারা সেটা কীভাবে না বোঝে?

যখন মানুষ শিকারকেন্দ্রিক ভবঘুড়ে জীবন ছেড়ে কৃষিকেন্দ্রিক স্তিতধী সভ্যতার সূচনা করল তখন তারা বন্য প্রাণী পোষ মানিয়ে গৃহপালিত করার চেষ্টা করত। সে সময়ে তারা নিশ্চই খেয়াল করেছিল যে এক ঋতুতে মিলন করলে অন্য ঋতুতে এদের বাচ্চা হয়।

মিলনের সাথে বংশবৃদ্ধির (REPRODUCTION) সম্পর্ক তথা সন্তান উৎপাদনে নিজেদের অবদান জেনে পুরুষেরা বিরাট বড় ধাক্কা খেয়েছিল। এর ফলে সমাজে বড় বড় পরিবর্তন হয়। সৃষ্টি হয় পুরুষশাসিত সমাজ। সেই সঙ্গে জন্ম নিল ‘যেমন বাপ তেমন ছেলে’ ’র মতো কিছু প্রবাদ। আর একই সময়ে শুরু হলো প্রায়োগিক জিনতত্ত্ব। 


প্রায়োগিক জিনতত্ত্ব বলতে বুঝাচ্ছি, বেছে বেছে প্রজনন ঘটানোর পদ্ধতিকে (SELECTIVE BREEDING)। ভাবতে অবাক লাগে তাত্ত্বিক দিকের আগেই জিনতত্ত্বের ব্যবহারিক দিক আবিষ্কার হয়! প্রাচীনকালের পশু পালকেরা প্রজননের জন্য সবচেয়ে ভালো পশুগুলো নির্বাচন করল এবং বাকিগুলো থেকে রেহাই পেতে চাইল। অনেকটা “কাজ ফুরালেই পাঁজি” প্রবাদের মতোন। এর ফলে ভালো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পশুর জন্ম হলো (অবশ্যই অনেক সময়ের ব্যবধানে)। 

একই সময়ে কৃষকদের হাতে গাছপালা বশে আনার পদ্ধতির গোড়াপত্তন ঘটে। তখনকার কৃষকেরা চাষবাসের সময় আগাছা পরিস্কার করত এবং উচ্চ ফলনশীল ও অনুকূল বৈশিষ্ট্যের জাতগুলোর বীজ বপন শুরু করলো। এঁদের হাত ধরেই এশিয়াতে ধান, গম, বার্লি ও খেজুর; আমেরিকায় ভুট্টা, টমেটো, আলু ও মরিচ এর জন্ম হয়। Brassica oleracea নামক বুনো শর্ষে থেকে এই কৃষকেরাই জন্ম দেন ক্যাবেজ, ব্রকলি সহ মোট ছয় ধরনের সুস্বাদু সবজির।

ফসল উৎপাদনে পরাগায়নের ভূমিকার কথা কৃষকেরা আগেই বুঝেছিল কিন্তু পরাগায়ন কীভাবে কাজ করে তা তারা বুঝতো না। এর কারন ব্যাখ্যা করতে তারা আশ্রয় নিতো যাদুবিদ্যার। তারা বলত এর মধ্যে যাদু আছে। 

প্রাচীনকালের ইতিহাসে জিনতত্ত্বের নানা ঘটনা পাওয়া যায় যেমন, কুকুরের জন্ম, চীনের নর্তকী ইঁদুর ইত্যাদি। তাছাড়া জিনতত্ত্বের নানা ধারনাও পাওয়া যায় যেমন, হিন্দুরা লক্ষ্য করেছিল সন্তানের বৈশিষ্ট্য মা-বাবার মতোন হয়; কিছু রোগবালাই বংশানুক্রমে আসে। মনুর শাস্ত্রে বলা হয়েছে, নিচু জাতের কাউকে বিয়ে না করতে। জাত-কূল প্রথার জন্ম এখান থেকেই। গ্রিসের দার্শনিক জেনোফেন তার কুকুরের প্রজনন করানোর সময় বলেছিলেন এ কাজে সবসময় ভালো কুকুর বেছে নিতে। 


◾গ্রিকযুগে বংশগতিবিদ্যা:

গ্রিকযুগে জ্ঞানচর্চার উত্তোরোত্তর প্রসার ঘটে। দার্শনিকরা গভীরভাবে ভাবতেন বংশগতি নিয়ে। জানতে চাইতেন সন্তান কেন বাবা-মার মতো হয়। 

এ নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭৭ খ্রিঃপূর্ব)। তিনি বলেছিলেন সন্তানের বৈশিষ্ট্যে বাবার অবদান যতটুকু তা প্রবাহিত হয় বীর্যের মাধ্যমে। নারীদেহের মধ্যেও এ ধরনের রস আছে। এই রসগুলো তৈরি হয় শরীরের সকল অঙ্গে, আঙুল থেকে আসে আঙুল তৈরির, পা থেকে আসে পা তৈরির রস। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে তার রসও থাকে। এই রস গুলো এরপর জননাঙ্গে জমা হয়। মিলনের পর নারীদেহের রস ও বীর্যের মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে যেই অঙ্গ তৈরির রস জেতে সন্তানের অঙ্গ ঠিক সেই অঙ্গের মতো হয়। মানে যদি বাবার আঙুল তৈরির রস জেতে তাহলে সন্তানের আঙুল বাবার মতো হবে। 

সক্রেটিস আবাব় সন্তান কেন মাঝে মধ্যে বাবা-মার মতো হয় না সেই প্রশ্ন চিহ্নিত করেন (কেন হয় না তা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব)। 

অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিঃপূর্ব) বলেন যে সন্তানের বৈশিষ্ট্য বীর্যের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় আর নারীদেহ সন্তানের দেহ গঠনে প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করে। কেন্তু এই তত্ত্বের সমস্যা হলো এতে শুধু ছেলেশিশুর জন্ম হবে, যাহোক তিনি তার তত্ত্ব সংশোধন করলেন এই বলে যে গর্ভাবস্থায় মেয়েদের রক্ত ঝামেলা পাকালে মেয়েশিশুর জন্ম হয় (নিঃসন্দেহে এটা অ্যারিস্টটলের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিপ্রকাশ)! প্রায় কয়েকশ বছর অ্যারিস্টটলের এই তত্ত্ব প্রচলিত ছিল যদিও হিপোক্রেটিসের তত্ত্ব অ্যারিস্টটলের থেকে বেশী গ্রহণযোগ্য ছিল। 

যাহোক তৎকালীন জ্ঞান দিয়ে বংশগতির (HEREDITY) কিছুটা সমাধান (সম্পূর্ণ ভূল!) করা গেলেও ‘কেনো সন্তান কখনো কখনো বাবা-মা কারো মতোই হয় না’ ‘র সমাধান করা যায়নি। প্রায়ই দেখা যায় বাবা-মার চুল কোকড়া না হলেও সন্তানের চুল কোকড়া। এ ব্যাপারে দার্শনিক ইম্পেডোক্লিসের মতবাদটা বেশ মজার, তিনি বলেছিলেন গর্ভাবস্থায় নারী কোনো পুরুষ মূর্তির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলে এমনটা হতে পারে!!!


◾ রোমানযুগে বংশগতিবিদ্যা: 

দর্শনচর্চায় রোমানদের তেমন এক উৎসাহ ছিলো না। সমরবিজ্ঞানই ছিল তাদের আগ্রহের কেন্দ্র। জিনতত্ত্বে তারা আধুনিক কিছু ধারণার বদলে গ্রিকদের থেকেও ‘ঋণাত্মক’ ধারণা যোগ করেছিল। তারা বলেছিল, মেয়ে ঘোড়াগুলো পুরুষ ঘোড়ার সাহায্য ছাড়াই সন্তান ধারণ করতে পারে (ক্যামনে কী, পুরুষের কোনো প্রয়োজন নাই!)।


◾ মধ্যযুগে এবং রেনেঁসার সময়ে বংশগতিবিদ্যা: 

রোমানযুগে যা জ্ঞানচর্চা চলত, মধ্যযুগে তার সিঁকিভাগও হয়নি। সবই চার্চের কীর্তি। চার্চের অধীনে জ্ঞানচর্চা স্থবীর হয়ে পড়ে (তবে মুসলিম সাম্রাজ্যে তখন জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়, বংশগতিবিদ্যায় তাদের তেমন অবদান না থাকলেও চিকিৎসাশাস্ত্রে তারা অর্জন করেছিল ঈর্ষণীয় সাফল্য)। জন্ম হয় স্বতস্ফূর্ত সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার। এ ধারণা মতে, ব্যাঙ, পোকা কাদামাটি থেকে জন্মে। ঘোড়ার লেজ একসময় পোকা হয়ে যায়। শিশির থেকে মাছ হয়। মানুষের মনে এই ধারণা জন্মেছিল কারণ তারা অহরহই দেখত কাদা থেকে ব্যাঙ, পোকা বেরোয়। যদিও এ ধারণা গ্রিকদের মাথায় বের হয় প্রথমে, মধ্যযুগীয়রা একে অতিরঞ্জিত করে মাত্র। স্বতস্ফূর্ত সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে জিনতত্ত্বের কোনো দরকার নেই। এই তত্ত্ব অনুসারে সন্তান বাবা-মার বৈশিষ্ট্য পাচ্ছে কিনা এই প্রশ্নই অর্থহীন। 


যাহোক বিজ্ঞান এগিয়ে চলল, সপ্তদশ শতাব্দীতে ইতালির বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো রেডির পরীক্ষণের কশাঘাতে ‘স্বতস্ফূর্ত সৃষ্টি প্রক্রিয়া’ মিথ্যা প্রমানিত হলো। তাঁর পরীক্ষাটা অতি সরল, তিনি দুটো কৌটো নিয়েছিলেন একটি খোলা অন্যটির ঢাকনা আছে। উভয় কৌটোয় তিনি দু টুকরো মাংস রাখলেন। একটি কৌটোর ঢাকনা আটকে দিলেন অন্যটি খোলা রাখলেন। কিছুদিন পরে দেখা গেল খোলা কৌটো থেকে লার্ভা জন্মাচ্ছে এবং সেগুলো বড় হয়ে মাছি হয় উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু বন্ধ কৌটোয় দৃশ্যমান কোনো কিছুই সৃষ্টি হয়নি। এরপরেও স্বতস্ফূর্ত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিল হয়নি। 


মাছি, মাছের স্বতস্ফূর্ত সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকে এক এক করে উড়িয়ে দিলেন শখের বিজ্ঞানী অ্যান্থন ভন লিউয়েন হুক (রবার্ট হুক ১৬৩৫-১৭০৩ না)। ইনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন ক্ষুদ্র প্রণীদের জীবণধারা। মাছিদের উপরে করা তার গবেষণা ছিল অসাধারণ। তিনিই আবিষ্কার করলেন যে মাছি সহ ক্ষুদ্র প্রাণীদের মধ্যেও অন্যান্য বড় প্রাণীদের মতোই বংশবিস্তারে যৌনতার বিষয় জড়িত। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন কোষপ্রাচীর ছাড়া অন্যান্য কোষীয় বস্তু এবং শুক্রাণু যা বীর্যের মধ্যে সাঁতরে বেড়ায়। তবে তার শুক্রাণু আবিস্কার নতুন কিছু সমস্যার সৃষ্টি করল। অনেকে ভাবলেন নতুন পোকা আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেকে (এর মধ্যে লিউয়েন হুকও আছেন) মনে করতেন একটি শুক্রাণুতে একটি স্বতন্ত্র জীবসত্তা বাস করে। তবে এই ভাবনার একটা খুঁত ছিল যদি শুক্রাণুর মধ্যকার জীবটি পুরুষ হয় তাহলে তারও নিশ্চই একটা ক্ষুদ্র শুক্রাশয় আছে, তার শুক্রাণুর ভিতরের জীব যদি পুরুষ হয়...এই ভয়ঙ্কর খেলা অনন্তকাল চলতে থাকবে। 


যখন লিউয়েন হুক শুক্রাণু নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন তখন অন্য বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন বংশবৃদ্ধিতে নারীর ভূমিকা নিয়ে। উইলিয়াম হার্ভে (১৫৭৮-১৬৫৭) মুরগীর ভ্রুণ বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ করে তত্ত্ব দেন যে ‘সবকিছুই আসে ডিম থেকে’। তবে অনেক হরিণ, কুকুর ব্যবচ্ছেদ করেও হার্ভে স্তন্যপায়ীর কোনো ডিম খুঁজে পেলেন না। ২০০ বছর ধরে তার অনুসারীরা ডিম খুঁজে চললেন কিন্তু কেউ সেই ছলনাময়ীকে খুঁজে পেলেন না। তবে স্তন্যপায়ীর ডিমের অস্তিত্ব নিয়ে সবাই ছিলেন নিশ্চিত। স্তন্যপায়ীর ডিম্বাশয় আছে ডিম্বনালী আছে কিন্তু ডিম থাকবে না তাই কখনো হয়? তাই দুশো বছর পর যখন এক বিজ্ঞানী কুকুরের ডিম খুঁজে পেলেন তখন কেউ তেমন একটা অবাক হলেন না। আসলে স্তন্যপায়ীর ডিম খুবই রেয়ার, মাসে মাত্র একটা ডিম পারে এরা। তাছাড়া এই ডিম আণুবীক্ষনিক (তাই ডিম্বাণু বলা বাঞ্ছনীয়)। তাই এতো সময় লেগেছিল খুঁজে বের করতে।

এর মধ্যে উদ্ভিদের যৌনতার ব্যাপারেও বেশ অগ্রগতি হলো। ১৭০০ সালের মধ্যেই বিজ্ঞানী ক্যামেরিয়াস (১৬৬৫-১৭২১) উদ্ভিদের যৌন আচরণের অনেকখানি অংশ আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখালেন প্রাণীদের অনুরূপ উদ্ভিদেও জননাঙ্গ আছে। তিনি বললেন যে পুরুষ ফুলের পরাগরেণু প্রাণীর বীর্যের মতো, এরা স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে পতিত হলে ফল উৎপন্ন হয়।

তাই, ১৮০০ সালের মধ্যেই প্রাণী ও উদ্ভিদের যৌনতার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল।


◾ ব্যবহারিক কৃষিকাজ থেকে জিনতত্ত্বের সূচনা: 

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কৃষিকাজে ব্যাপক অগ্রগতি হতে থাকে। এ থেকেই একসময় জিন ধারণার জন্ম হয়। এঁরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা থেকে জিনতত্ত্বের নানা দিক বুঝতে পেরেছিল। 


ক. কিছু কিছু সুস্থিত জাত রয়েছে, যারা খুবই শুদ্ধবাদী ধরণের। এসব ক্ষেত্রে সন্তানের বৈশিষ্ট্য সবসময় বাবা-মার মতো হয়। যেমন, ম্যাকিনটশ আপেল, আরবের ঘোড়া, ল্যাব্রাডর রিট্রিভার কুকুর। অন্যদিকে কিছু জাত মাঝে মধ্যেই বাবা-মার মতো হয় না।

খ. দুই ধরণের প্রাণীর মধ্যে প্রজনন ঘটিয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যের সংকর প্রাণীর জন্ম দেয়া যায়। যেমন, গাধা আর ঘোড়ার মিলনে জন্ম হয় খচ্চরের। তবে সবধরণের সংকর সম্ভব না। আবার সংকরগুলোর মধ্যে প্রজনন করালে বৈচিত্র চরমে পৌছে।

গ. সব ধরণের জীবই এমনকি শুদ্ধবাদীরাও কালে-ভদ্রে এমন সন্তান জন্ম দেয় যাদের বৈশিষ্ট্য মা-বাবা ‘র সাথে মিলে না (এটার কারণ অন্য পর্বের জন্য তুলে রাখলাম)। মাঝে মাঝে সেগুলো বিকটদর্শন হয় আবার কখনো মা-বাবা থেকে বেশী মাত্রায় ভিন্ন হয় না। যেমন, ১৮০০ সালের দিকের ‘বামন’ ভেড়াগুলো।


কিন্তু সংকরায়ণের জন্য উপযোগী নিয়ম সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। সংকরায়ণের মাধ্যমে কখনো ভালো বৈশিষ্ট্যের জীব পেলেও বেশিরভাগ সময় খারাপ বৈশিষ্ট্যেরই দেখা মিলত। তাছাড়া প্রক্রিয়াটা ছিল খুবই দীর্ঘ। এজন্য প্রয়োজন পড়ল সংকরায়ণের জন্য অধিক ফলদায়ক নিয়ম উদ্ভাবনের।


তারা অনেক চেষ্টার পরেও মা-বাবার বৈশিষ্ট্য কীভাবে সন্তানসন্ততিতে সঞ্চারিত হয় তার সমাধান করতে পারেননি। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষকরা যেন অতল সমুদ্রে পড়লেন। তাছাড়া সেসময় জেনেটিক মার্কিং প্রযুক্তি না থাকায় ক্ষুদ্র প্রাণীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রজন্মগুলোর হিসাবই রাখতে পারতেন না। সমস্যাটার কাছে গোটা মনুষ্যজাতি যেন অসহায় হয়ে পড়ল। বিজ্ঞানীরা এরপর এর থেকে সহজ সমস্যাগুলোয় মন দিলেন। আর তাই শেষমেষ যখন আসলেই বংশগতিবিদ্যার তত্ত্ব (তত্ত্ব না বলে LAW বলা উচিৎ) আবিষ্কৃত হলো, তিরিশ বছর পর্যন্ত সেটা বিজ্ঞ সমাজে পাত্তাই পেলো না! 

.........চলবে.........

পরবর্তী পর্বে থাকবে মেন্ডেলীয় জিনতত্ত্ব ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।


◾ তথ্যসূত্র:

() HISTORY OF GENETICS FROM PRE HISTORIC TIMES TO THE REDISCOVERY OF MENDEL’S LAWS BY H. STUBBE, M.I.T PRESS.

(২) A SHORT HISTORY OF GENETICS BY L. C. PUNN, McGRAW HILL. 

(C.G.G এর আঙ্গিকে লেখা)


©️ Naturalist's View 


Comments

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা