পৃথিবীর গতি দুই নয় বরং তিন ধরণের

একটা সমস্যা দিয়ে শুরু করি। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০ সালের দিকে গ্রিক গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ হিপ্পার্কাস একটা বিরল ঘটনা লক্ষ করেন। তিনি দেখেন যে স্পিকা নক্ষত্রের অবস্থান ১৫০ বছর আগে রেকর্ড করা নক্ষত্রের তালিকা থেকে ২° পূর্বে সরে গিয়েছে। পরে তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে অন্যান্য নক্ষত্রের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। তিনি এই ঘটনার কারণ হিসেবে দায়ী করেন খ-গোলকের (খ-গোলক বা সেলেস্টিয়াল স্ফিয়ার হলো বিশাল এক কল্পিত গোলক যার কেন্দ্রে পৃথিবীর অবস্থান এবং যা তৎকালীন জিওসেন্ট্রিক মডেল এর কারনে সৃষ্ট। এই গোলকের মধ্যে বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ ও সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এই গোলকের যে পথে ঘোরে তাকে বলা হয় এক্লিপ্টিক। এই গোলকের পৃথিবীর মতোই রয়েছে সাউথ ও নর্থ পোল, ইকুয়েটর।) ঘুর্ণনকে।


চিত্র: খ-গোলক বা Celestial Sphere. অতীতে জ্যোতিষ্কসমূহের অবস্থান এই কল্পত

 গোলকের সাপেক্ষে নির্ণয় করা হতো।


 যাহোক এই ঘটনার কারণের মধ্যেই নিহিত পৃথিবীর তৃতীয় গতি-ওয়াবল অব দি আর্থ।

আমরা জানি, পৃথিবীর দুই ধরণের গতি— একটি আহ্নিক অপরটি বার্ষিক। পৃথিবী ২৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিটে যে প্রচন্ড গতির জন্য (মেরুতে এই গতি শূণ্য কিন্তু ইকুয়েটরে ১৬৭৫কিমি/ঘন্টা, অনেকটা লাটিমের ঘুর্ণনের মতো।) নিজ অক্ষের (উত্তর দক্ষিণ মেরুর সংযোগকারী রেখা হলো অক্ষ।) চারিপাশে একটি ঘুর্ণন সম্পন্ন সম্পন্ন করে তাকে বলে আহ্নিক গতি। এই আহ্নিক গতির কারণেই দিন-রাত্রি হয়। আবার, পৃথিবী তার যে গতির কারনে প্রতি এক বছরে সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার পথে একটি ঘুর্ণন সম্পন্ন করে তাকে বলে বার্ষিক গতি। বার্ষিক গতির জন্য ঝতু পরিবর্তন হয়। এদুটো ছাড়াও পৃথিবীর তৃতীয় ধরণের গতি রয়েছে যার গালভরা নাম ওয়াবল অব দি আর্থ (Wobble Of the Earth ছাড়াও Axial Precession ও বলা হয়)। পৃথিবী যখন নিজ অক্ষের উপর ঘুরে তখন সে সোজা লম্বভাবে ঘুরে না বরং ২৩.৫° কাত হয়ে ঘুরে, মূলত লম্বের সাথে অক্ষের ব্যবধান ২৩.৫°। পৃথিবী ছাড়া অন্য গ্রহও বিভিন্ন কোণে অক্ষ বরাবর ঘোড়ে। যেমন, শুক্র গ্রহ ১৭৭° এবং ইউরেনাস গ্রহ ৯৭° কোণে কাত হয়ে ঘোরে। উদ্দীপনার বিষয় হলো, পৃথিবীর এই অক্ষটিও আরেকভাবে ঘুরছে। তবে এই ঘুর্ণন নির্দিষ্ট জায়গায় দাড়িয়ে ঘোরার মতো নয়। জিনিসটা অনেকটা মগে পেনসিল রেখে ফুঁ দিলে পেনসিল যেভাবে ঘোরে সেরকম। কিংবা চরকি মাটিতে রেখে ঘোরানোর সময় এটার যেমন ডান থেকে বামে (ঘুর্নণের দিকের ওপর নির্ভরশীল) ঘোরার মতো। অর্থ্যাৎ, পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘোরা ছাড়াও ত্রিমাত্রিকভাবে ঘোরে। এই ঘুর্ণনের গতি অত্যন্ত ধীর।

চিত্র: ওয়াবল অব দি আর্থ।

 

  একটি পূর্ণ ঘুর্ণন (ওয়াবল) সম্পন্ন হতে সময় লাগে ২৬ হাজার বছর! মানে ১৩ হাজার বছর পরে পৃথিবীর উত্তর মেরুর অবস্থান বর্তমানের বিপরীত হবে! বর্তমানে কেউ যদি উত্তর মেরুতে গিয়ে আকাশের দিকে তাকায় তাহলে সে দেখবে পোলারিস নক্ষত্র কিন্তু ১৩ হাজার বছর পরে একই স্থান থেকে আবার কেউ পর্যবেক্ষণ করে তাহলে সে দেখবে ভেগা নক্ষত্র! পৃথিবীর অক্ষের এই ঘুর্ণনের কারন চাদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব। প্রত্যেক বছরে অতি অল্প পরিমাণে পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণন হচ্ছে। প্রতি ১০০ বছরে এই পরিবর্তন ১° এর কাছাকাছি। হিপ্পার্কাস যে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তার কারণ এটাই— পৃথিবীর অক্ষের ঘূর্ণন।

GIF কৃতজ্ঞতা: climate.nasa


©️ Naturalist's View

Comments

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা