ইগলু যেভাবে এর ভেতরের পরিবেশকে উষ্ণ এবং আরামদায়ক রাখে

◾শুরুর কথা:

আদর্শলিপিতে বর্ণমালা শেখাতে 'I' দিয়ে শব্দ গঠনে প্রায়ই Igloo শব্দটি লেখা হয়। বলা যেতে পারে অনেকেই এই শব্দটির সাথে প্রথম এভাবেই পরিচিত হয়। বরফ দিয়ে তৈরি জিনিসের ভেতর উষ্ণ পরিবেশ কি করে থাকতে পারে? —এই প্রশ্ন বেশিরভাগ শিশুরই শৈশবের ক্লান্তির কারণ হতো। তবে ছোটবেলার এই প্রশ্নগুলো একসময় আর মনে থাকে না, হারিয়ে যায় কালের অতল গহ্বরে। আজ আমরা শৈশবের এই কৌতুহল জাগানিয়া প্রশ্নটির উত্তর খুঁজব।


চিত্র: একটি ইগলু।


◾ইগলুর ভেতরের তাপমাত্রা:

ইগলু বরফ দিয়ে তৈরি, তাই ইগলুর ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রার সমান হওয়া উচিত। ইগলুর ভেতরের তাপমাত্রা -7° থেকে 16° হতে পারে। আপনি এখন হয়তো মনে করবেন ইগলুর বাইরেও এই একই তাপমাত্রা থাকার কথা। কিন্তু না ইগলুর ভেতরে যদি -7 থেকে 16 °C হয় তাহলে বাইরের তাপমাত্রা হবে হয়তো -49 থেকে -55 °C। এজন্যই মূলত মানুষ ইগলুর ভিতরে বেঁচে থাকতে পারে।


◾ ইগলুর ভেতরে তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশ থেকে এতো বেশি হয় কেন?

এর কারণ ৩ টি—

প্রথমত, বাতাসের বাতাসের আপেক্ষিক তাপ 1050 J/kgK। অর্থাৎ 1 কেজি বাতাসের তাপমাত্রা 1 kelvin বাড়াতে  1050 Joul তাপের প্রয়োজন। এখন কোনো পদার্থের আপেক্ষিক তাপ যত বেশি সেটা তত কম তাপ পরিবহন করে। অর্থাৎ বাতাস তাপ গ্রহণ করে গরম হতেও বেশি সময় নেয় তাপ বর্জন করে ঠান্ডা হতেও বেশি সময় নেয়। ইগলুকে বরফ নির্মিত মনে হলেও এটা আসলে বরফ নির্মিত নয়। এটা স্নো বা তুষার দিয়ে তৈরি। তুষারকে চাপ দিয়ে ব্লকের মতো বানিয়ে ভূমির ওপর ডোম আকারে বসিয়ে ইগলু তৈরি করা হয়। ইগলুর এই বিল্ডিং ব্লকগুলো তুষারকে মন্ডের মতো করে তৈরি করা হয় বলে এর ভেতর প্রচুর পরিমাণে বাতাস রয়ে যায়। বলা যায় তুষারকণার ফাঁকে ফাঁকে বায়ুকণা রয়েছে। এই বাতাস তাপ কুপরিবাহী বলে বাইরের পরিবেশ থেকে সহজে তাপগ্রহণ করে না। ফলে ইগলু থাকে গরম।।


দ্বিতীয়ত, ইগলুর দেয়াল এর ভেতরের পরিবেশকে বাইরের বায়ুপ্রবাহ থেকে আলাদা রাখে। বায়ুপ্রবাহ কিন্তু বাষ্পায়নের হার বাড়ায়, ফলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। একারণে তপ্ত রোদ থেকে ঘরে ফিরে ফ্যান ছাড়লে ঠান্ডা লাগে, কারণ বায়ুপ্রবাহ শরীরের উপরিভাগের ঘামের বাষ্পীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে ফলে ঘাম বাষ্পীভূত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ শরীর থেকে শোষণ করে। ইগলুর ভেতরে বায়ুপ্রবাহ থাকে না, ফলে বাষ্পায়নের হার কমে যায়। এবং শরীর উষ্ণ থাকে।


তৃতীয়ত, ইগলুর ভেতরে মানুষ থাকা মানে হলো ইগলুর ভেতরে জ্বলন্ত একটা চুলা থাকা। কারণ আমাদের শরীরের প্রতিনিয়ত শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করে। আগেই বলেছি ইগলুর দেয়ালে বায়ুকণিকা বিদ্যমান। এই বাতাসের কণাগুলো ইগলুর ভেতরে উৎপন্ন এই তাপ বাইরে যেতে দেয় না। ফলে ইগলু উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে থাকে। এছাড়া, এই তাপের কারণে ইগলুর দেয়ালের ভেতরের অংশের তাপ বেড়ে তুষার গলতে শুরু করে। ফলে ভিতরের দেয়ালে তুষারগলা পানির একটা স্তর বা লেয়ার তৈরি হয়। পানির আপেক্ষিক তাপ 4200 J/kg K। অর্থাৎ বাতাসের মতো পানিও তাপ কুপরিবাহী। তাই এই তুষার গলা পানির স্তর ভেতরের তাপকে বাইরে যেতে বাধা দেয়।

এই সবকিছু একসাথে হয় বিধায় ইগলু এতো উষ্ণ হয়।


◾ইগলুর কাঠামো ভঙ্গুর?

যদি বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রা হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়, তাহলে ইগলুর দেয়ালের তুষার গলে এর কাঠামো ভেঙে যেতে পারে। তবে যদি তাপের তেমন কোনো পরিবর্তন না হয় তাহলে এটা ভাঙবে না কারণ ইগলুর বিল্ডিং ব্লকগুলো ওজনে অত্যন্ত হাল্কা কারণ এর ভেতর বরফের চেয়ে বাতাস বেশি। তাছাড়া, ইগলু গম্বুজ বা ডোম আকৃতিতে তৈরি করা হয়। এই ডোম আকৃতি প্রকৃতিতে বিদ্যমান শক্তিশালী কাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম।


◾প্রাকৃতিক ইগলু:

ইগলু একমাত্র মানুষই নয় বরফাঞ্চলের অনেক প্রাণীরাও (যেমন, পোলার বেয়ার) তৈরি করতে সক্ষম। তবে তারা মানুষের মতো ভূমির উপরে ডোমাকৃতিতে ইগলু তৈরি করে না। তুষারের স্তরে গর্ত খুঁড়ে সেখানে ঢুকে বসে থাকে। মানুষের তৈরি ডিজাইন অবশ্য এর থেকে অনেক উন্নত কারণ এতে তুষারের সংস্পর্শে থাকা লাগে না।

©️ Naturalist's View 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা