ডপেলগ্যাঙ্গার: যে কারণে দুই বা ততোধিক লোকের চেহারা একই মনে হয়

২০১৭ সালের ঘটনাটা মনে আছে? ঐ যে মেসির মতো দেখতে রিজা পেরেস্তেস নামের সেই লোকটার কথা, যাকে অনেকেই মেসি ভেবে বসেছিলেন। এমনকি ইরানি এই লোকটার ছবিকে মেসির ছবি ভেবে একটা সংবাদমাধ্যম খবর পর্যন্ত প্রচার করেছে।



 মনে না থাকলে মনে করিয়ে দিচ্ছি, কার্ডের বাম পাশের জন হলেন রিজা পেরেস্তেস এবং ডান পাশের জন হলেন মেসি। কিন্তু এতো এতো মানুষ রিজাকে মেসি ভেবে ভূল করলেন কেন? শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝতে পারবেন।


সিনারিও ১: 

ধরুন, আপনি ফেসবুকে স্ক্রলিং করছেন, পরিচিত জনদের ছবি দেখছেন নিউজ ফিডে, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক কিভাবে বুঝলো এই চেহারা আপনি আগে দেখেছেন?


সিনারিও ২:

আবারও আপনি ফেসবুকে স্ক্রলিং করছেন, হঠাৎ দেখতে পেলেন আপনার মতো দেখতে হুবুহু একই চেহারার কোনো লোককে। হয়তো ভাববেন, "আরে দাদী-নানীরা তো ঠিকই কইছে, একই চেহারার অনেক মানুষ হয়!" যদিও আপনার ভাবনা কোনো বিজ্ঞানসম্মত উত্তর নয়, তবে কয়েকজন মানুষের চেহারা আমাদের কাছে হুবুহু একই মনে হতে পারে। এবং এর কারণ নিহিত রয়েছে, সিনারিও ১ এ উত্থাপিত প্রশ্নে!


মানুষের চেহারা জিনিসটা কী? বলা যেতে পারে একটা নাক ও মুখ, দুইটা চোখ, গোলাপি কিংবা কালো ঠোঁট সম্বলিত "একটা প্যাটার্ন" যা আমাদের মস্তিষ্কে একটা নির্দিষ্ট প্রকারের উদ্দীপনার সঞ্চার করে তাই চেহারা।


আমাদের মস্তিষ্ক কিভাবে কোনো চেহারাকে "প্রসেস" করে সেটা বুঝলেই "ডপেলগ্যাঙ্গার" তথা দুই বা ততোধিক মানুষের মধ্যে একই চেহারা খুঁজে পাওয়ার কারণটা বোঝা যাবে। 

আমরা যখন কোনো কিছু দেখি তখন আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট নিউরন উদ্দীপিত হয়। যেমন গাছের দিকে তাকালে কিছু নির্দিষ্ট নিউরন উদ্দীপিত হয়, আবার ঘরের দিকে তাকালে অন্য নিউরন উদ্দীপিত হয়। তেমনই, কারো চেহারা দেখলে  মস্তিষ্কের ফিউসিফর্ম ফেস এরিয়া (এফএফএ) এর নিউরন সমূহ উদ্দীপিত হয় (এটি ইনফিরিয়র টেম্পোরাল কর্টেক্স, ফিউসিফর্ম গাইরাসে অবস্থিত, চিত্র দ্রষ্টব্য)। 

চিত্র: কিউসিফর্ম গাইরাস অংশ চিহ্নিত মস্তিষ্কের ছবি। নীল চিহ্নিত অংশেই মূলত কোনো চেহারা বিশেষ প্রক্রিয়া করা হয়।


এই নিউরন গুলো উদ্দীপিত হয়ে একটা নির্দিষ্ট চেহারার জন্য নির্দিষ্ট প্যাটার্ন রচনা করে। মূলত আমাদের মস্তিষ্ক কোনো চেহারা দেখে না, দেখে এই প্যাটার্ন! উল্লেখ্য যদি অপ্রত্যাশিত কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কিউসিফর্ম ফেস এরিয়া অঞ্চলের এই নিউরন সমূহ উদ্দীপিত হয় তখন সেখানেও আমরা "চেহারা" সদৃশ কিছু দেখতে পাই, একে প্যারিডোলিয়া বলা হয়! (দ্বিতীয় কমেন্টের ছবিটা দেখুন, কী চেহারা বলে মনে হচ্ছে না?)


যাহোক, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে কোনো চেহারার একেবারে বিশেষ ডিটেইলস গুলো আমলে নেয় না, মানে কোনো চেহারার অতি সূক্ষ্ম জিনিসগুলো যেমন নাকের ডগার সাইজ, দৈর্ঘ্য, ভ্রুর আকৃতি ইত্যাদি। তাই প্রথম দেখায় দুজন মানুষকে দেখতে একই মনে হতেই পারে, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক চেহারা চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট কিছু জিনিসে ম্যাচ পেলেই দুটো চেহারা একই ধরে নেয়। যেমন কার্ডে থাকা মেসির মতো দেখতে রিজার (বামে) কথাই ধরুন। মেসির চেহারার সাথে কয়েকটা জিনিস ছাড়া বাকি সব দিক থেকেই চেহারা আলাদা, যেমন মেসির নাক আর রিজার নাক দেখতে একই নয়, মেসির চোখদুটোয় একটু গর্তের মতো আছে যেটা রিজার বেলায় নেই। কিন্তু মস্তিষ্ক তার মেমোরিতে থাকা মেসির চেহারার সাথে রিজার চেহারার ম্যাচ খুঁজে পায় কারণ  কিউসিফর্ম এরিয়ার নিউরনসমূহে সঞ্চারিত প্যাটার্নের গুরুত্বপূর্ণ (অন্তত মস্তিষ্কের কাছে) অংশের সদৃশতা থাকা।


তবে, সবাই হয়তো রিজা আর মেসির চেহারা একই মনে করবে না, কারণ কারো কারো ফেসিয়াল রিকগনিশনের ক্ষমতা ভালো। তাছাড়া, অনেক বছর ধরে যারা মেসির চেহারা দেখেছে তারা হয়তো কোনো মিলই খুঁজে পাবে না। এজন্য ২০১৭ সালের দিকে রিজাকে নিয়ে দুটি দল হয়ে যায়, কেউ বলে রিজা মেসির মতো দেখতে, কেউ বলে তাদের চেহারার মধ্যে কোনো মিলই নেই!

এখন, মেশিন লার্নিং সিস্টেম এতোটা উন্নত হয়েছে যে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম মানুষের চেয়ে শতগুণ অ্যাক্যুরেসির সাথে চেহারা শনাক্ত করতে সক্ষম!


©️ Naturalist's View

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা