ব্রাজিল নাট ইফেক্ট

কখনও লক্ষ্য করেছেন যে, চিপসের প্যাকেটে কেন বড় আকারের গুলো সবসময় উপরে এবং ছোট আকারের গুলো সবসময় নিচে থাকে? কিংবা চানাচুরের প্যাকেটে কেন বাদামগুলো সবসময় উপরে থাকে? কখনো ভেবে দেখেছেন বালির সাথে নুড়িপাথর মিশিয়ে ঝাকালে কেন নুড়িপাথর উপরে এবং বালির ছোট কণাগুলো নিচে চলে যায়? দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই সংগঠিত হওয়া এই ঘটনাটিকে সাধারণত "ব্রাজিল নাট ইফেক্ট" বলা হয়। বিভিন্ন ধরণের বাদামের আকৃতি ভিন্ন। কিছু ছোট আকারের চিনা বাদাম আর কিছু ব্রাজিল নাট একসাথে মিশিয়ে ঝাকালে দেখা যায় ব্রাজিল নাটগুলো উপরে উঠে আসে। এই ঘটনার মাধ্যমে ইফেক্টটি সর্বপ্রথম কারো নজরে আসে বলেই হয়তো ইফেক্টটির এই নামকরণ করা হয়েছে। ব্রাজিল নাট ইফেক্টের পেছনের বিজ্ঞান বেশ জটিল এবং বিভিন্ন পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন নীতির উপর নির্ভরশীল।


চিত্র ১: ব্রাজিল নাট।


◾প্রাককথন:

আমরা পদার্থের তিনটি অবস্থার সাথে পরিচিত: কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয়। আমরা জানি যে পাথর কঠিন, সমুদ্রের পানি তরল এবং আমরা যে বায়ু শ্বাস হিসেবে গ্রহণ করি তা হল গ্যাস। কিন্তু কিছু পদার্থের আচরণের ক্ষেত্রে শ্রেণীবিভাগ সবসময় সবকিছুকে ধারণ করতে পারে না। আপনি বালিকে কঠিনের মতো স্তূপ করতে পারেন আবার এটাকে তরলের মতো ঢালতে পারেন। কারণ এটা একটা দানাদার (Granular) পদার্থ, যা অনেকগুলো পৃথক কণা দ্বারা গঠিত।


দানাদার পদার্থের আকার ছোট থেকে বিশাল বড় পর্যন্ত হতে পারে, যেমন বালি থেকে শুরু করে অনেক বড় পাথরও হতে পারে। দানাদার পদার্থকে তরলের বৈশিষ্ট্য দেখাতে হলে এর মধ্যে অনেক অনেক ছোট (ঐ বস্তুর সামগ্রিক আকারের সাপেক্ষে) দানা একত্রে থাকতে হবে। পাহাড়ের নিচে গড়িয়ে পড়তে থাকা কয়েকটি পাথর তরলের মতো কাজ করছে না, তবে ভূমিধ্বসের সময় পাহাড়ের নিচে হাজার হাজার পাথর একসাথে গড়িয়ে পড়ছে বিধায় এটা তরলের মতো আচরণ করছে। একইভাবে, বালির একটা দানা নিজে থেকে তরলের মতো কাজ করে না, তবে এটা তরলের মতো প্রবাহিত হতে পারে যখন একটা পাত্র থেকে অনেকগুলো দানা একসাথে ঢালা হয়।

চিত্র ২: দানাদার পরিচলন বা গ্রানুলার কনভেকশন প্রক্রিয়া।


◾ব্রাজিল নাট ইফেক্টের কারণ:

আপনি যদি একটি পাত্রে বিভিন্ন দানাদার উপকরণ রাখেন এবং যদি পাত্রটি ঝাঁকাতে পারেন বা সেগুলি মেশানোর জন্য পাত্রটাকে ঘোরাতে পারেন তাহলে ঝাঁকুনি বা ঘূর্ণায়মান গতির ফলে দানাগুলো লাফিয়ে উঠতে বা একে অপরের উপর গড়িয়ে যায়। যেহেতু ছোট দানাগুলো বড় দানার মধ্যবর্তী স্থানের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে যেতে থাকে তাই বড় কণাগুলো পারকোলেশন (Perlocation) নামক প্রক্রিয়ায় উপরের দিকে চলে যায় এবং ছোটগুলো নিচে নেমে আসে।


চিত্র ১: পারলোকেশন প্রক্রিয়ায় বড় দানা, ছোট দানার উপরে ওঠে।


প্লবতাও (Buoyancy) এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে, প্লবতা যে দানাগুলো ঘনভাবে থাকে (যেমন, বালি, চিপসের গুড়া) সেগুলোকে ডুবিয়ে দেয় এবং কম ঘন দানাগুলিকে (যেমন, নুড়িপাথড়, কাকড়, পাথড়, চিপসের বড় অংশ) উপরে ভাসিয়ে দেয়। আরেকটি কারণ হলো, দানাদার পরিচলন (Granular Convection), যার কারণে দানাদার পদার্থগুলো কম্পিত হওয়ার সময় সেগুলি পরিচলনের মতো সঞ্চালনের প্যাটার্নে চলে যায়। বৃহত্তর, ঘন অংশগুলো সঞ্চালন প্যাটার্ন অনুসরণ করে উপরের দিকে যায় কিন্তু নিচে যায় না। আর ক্ষুদ্রতর অংশগুলো নিচে চলে যায়। গ্রানুলার কনভেকশনে ঝাকানোর প্রয়োজন পড়ে না।


চিত্র ৩: চিনাবাদাম ও ব্রাজিল নাটের মিশ্রণে ব্রাজিল নাটের উপরের দিকে আরোহন। (এক্স-রে অনুসারে)


এছাড়াও কণা এবং পাত্রের গায়ের মধ্যে ফাকাস্থানে থাকা বায়ু একটি প্রভাব তৈরি করে বলে মনে করা হয়।

©️ Naturalist's View


Comments

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা