অর্ধেক মস্তিষ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব?

◾শুরুর কথা:

মস্তিষ্ককে বলা হয় মহাবিশ্বের সবচে' জটিল কাঠামো। আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে মানে ৮৬০০ কোটি নিউরন। তুলনা করতে গেলে বলা যায়, পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে যে কটা তারা রয়েছে তার প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নিউরন রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কে। এই নিউরনগুলো আবার প্রত্যেকে আলাদাভাবে ১০০০০ টা অন্য নিউরনের সাথে যুক্ত হয়ে জটিল থেকেও জটিলতম কাঠামো গঠন করেছে। নিউরনের এই একে অপরের সাথে যে কানেকশন রয়েছে তা জন্মের পরে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে, এক কথায় ব্রেন প্রতিনিয়ত 'রি-ওয়্যার্ড' হতে থাকে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে, ধরুন আপনি কিছু দিন ধরে একটা গাণিতিক সমস্যা নিয়ে ভাবছেন, কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না। একদিন হঠাৎ সমস্যার সমাধান করে ফেললেন। কীভাবে করলেন? আসলে এতোদিন সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আপনার মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশন চেন্ঞ্জ হয়ে গিয়েছে, ব্রেনের সমস্যা সমাধানে জড়িত অংশের নিউরনগুলো আরো বেশিসংখ্যক নিউরনের সাথে সংযোগ তৈরি করেছে, ফলে আপনি সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছেন। আমাদের মস্তিষ্ক আসলে অত্যন্ত নমনীয়, যেকোনোক্ষেত্রেই এটা নিজের নিউরাল নেটওয়ার্ক পুনঃবিন্যস্ত করে ওই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।




◾মস্তিষ্কের দুই খন্ড থেকে এক খন্ড অপসারণ:

মেয়েটির নাম ক্যামেরুন। তার যখন বয়স চার বছর, তখন সে ভয়ানক মাত্রার মৃগীরোগে আক্রান্ত হয়। এর কারণে সে মাঝে মধ্যেই ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে ঢলে পড়তো। সমস্যাটি অভিভাবকের নজরে আসলে তাকে ডাক্তার দেখানো হয়। ধরা পড়ে RASMUSSEN'S ENCEPHALITICS রোগ। সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ক্যামেরুনের চিকিৎসকরা এটা জানতেন, তাই তাকে সুস্থ করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালে তার মস্তিষ্কে একটা সর্জারি করেন। দীর্ঘ ১২ ঘন্টার অপারেশন শেষে তারা ক্যামেরুনের মস্তিষ্কের অর্ধেক মানে একটি হেমিস্ফিয়ার অপসারণ করেন, এর বদলে খুলির মধ্যে বিশেষ ধরণের তরল রেখে দেন। কী মনে হয়? সে বাঁচেনি? বা অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে? আপনার সকল অনুমানকে ভুল প্রমানিত করে সে এখনো সুস্থ আছে। অপারেশনের পরে তার রোগটাও রীতিমতো সেরে যায়। ব্রেনের অর্ধেক অংশ অপসারণের পরেও সে স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতোই ছিলো। চিন্তা করা, কথা বলা, গান গাওয়া, অঙ্ক কষা ইত্যাদি কাজে অন্যদের তুলনায় তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। এমনকি সে স্কুলে খেলাধুলাও করতে সমর্থ হয়।


◾কেন এমন হলো?

ব্রেনের যে নিউরাল নেটওয়ার্কের পুনঃবিন্যস্ত (রি-ওয়্যার্ড) করার ক্ষমতা রয়েছে, সেটাই মূলত ব্রেনের নমনীয়তা। মানে, নমনীয় স্পঞ্জকে হাতে নিয়ে চাপ দিলে এটা যেমন সংকুচিত হয়, ঠিক তেমনই ব্রেন পরিবেশের উপর ভিত্তি করে রি-ওয়্যার্ড হয়।

ক্যামেরুনের মস্তিষ্কের এক খন্ড বা হেমিস্ফিয়ার অপসারণের পরও সে বেঁচে ছিলো। তার মানে এই নয় যে, অপসারণকৃত খন্ডটি তার দরকার ছিলো না। মস্তিষ্ক তার এক খন্ড হারানোর ফলে ওই অপসারণকৃত খন্ডের যা কাজ ছিলো তা করার জন্য অন্য খন্ডটিকে উপযোগী বানিয়ে ফেলে। মানে, অপসারণকৃত খন্ডে বিদ্যমান নিউরাল নেটওয়ার্কের অনুরুপ নিউরাল নেটওয়ার্ক অপর খন্ডে পুনঃবিন্যস্ত হয়। অর্থাৎ এতে বোঝা যায় যে ব্রেন আসলে কনভেনশনাল কোনো হার্ডওয়্যার নয় বরং এটা অনেকটা ফিল্ড প্রোগ্রামেবল গেট অ্যারে'র মতো। মস্তিষ্ক আসলে লাইভওয়্যার্ড। যার ফলে এক খন্ড ছাড়াই সে বেঁচে ছিলো।

©️ Naturalist's View

Comments

Popular posts from this blog

হোমিওপ্যাথি: বিজ্ঞান নাকি ছদ্মবিজ্ঞান?

বিবর্তনের নতুন প্যারাডাইম শিফট?

স্লিঙ্কি: মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শূন্যে ভেসে থাকে যে খেলনা